নদী যেমন ভাঙে, তেমনি নদী মানুষকে গড়তেও শেখায়। মেঘনার অববাহিকায় গড়ে ওঠা চাঁদপুর জেলার হাইমচর উপজেলার গল্পটাও ঠিক তেমনই এক অবিনাশী লড়াইয়ের। আর এই লড়াইয়ের সমান্তরালে যে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দী ধরে আলোর মশাল জ্বালিয়ে চলেছে, সেটি হলো "নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়" ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যাপীঠ কেবল এক টুকরো শিক্ষালয় নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন, আবেগ এবং গৌরবের প্রতীক।
২০২৬ সালে এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি তার সাফল্যের মুকুটে যুক্ত করেছে এক নতুন পালক। চাঁদপুর জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর, এবার এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় পর্যায়ে।
ঢাকার চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জাতীয় বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন মেলায় স্কুলটির ক্ষুদে বিজ্ঞানী ও শিক্ষকদের তৈরি "Dropout AI Alert App"চমকে দিয়েছে গোটা দেশকে। জাতীয় পর্যায়ে দখল করে নিয়েছে “১২ তম” স্থান
নদীভাঙনে বারবার স্থানান্তরিত হওয়া একটি গ্রামীণ স্কুল কীভাবে প্রযুক্তির শীর্ষ শিখরে পৌঁছাল?এ যেন এক রূপকথার মতো বাস্তব গল্প। ১৯২৮ থেকে আজকের মহীরূহ
আজ থেকে প্রায় ৯৮ বছর আগে, যখন এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখন আলোর দিশারী হয়ে এগিয়ে আসেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী "আলহাজ্ব আলী হোসেন মাঝি".১৯২৮ সালে তাঁরই হাত ধরে রোপিত হয়েছিল নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের বীজ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ফলাফলের দিক থেকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করতে শুরু করে।
তবে এই পথচলা মোটেও মসৃণ ছিল না। প্রমত্তা মেঘনার ভাঙাগড়ার খেলায় বারবার অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে এই বিদ্যালয়।
প্রথম অবস্থান: সাবেক মূল হাইমচর।
দ্বিতীয় অবস্থান: নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয় কালিখোলায়।
বর্তমান অবস্থান: ২০০৩ সালের ভয়াবহ নদীভাঙনে কালিখোলার ক্যাম্পাসটিও বিলীন হয়ে গেলে বিদ্যালয়টি পুনরায় স্থানান্তরিত হয় বর্তমান 'জনতা বাজার' সংলগ্ন মনোরম জায়গায়।
বারবার ঠিকানা বদলালেও বদলায়নি এর শিক্ষার মান এবং আদর্শ। ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার জেগে উঠেছে নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ২১ জন দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক-কর্মচারী এবং ৮০০ জন অদম্য শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা প্রতিদিন এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এই প্রাঙ্গণে সমবেত হয়।
২০২৬ সালে জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
জাতীয় প্রোগ্রাম, জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা কিংবা এসএসসিতে হাইমচর উপজেলায় শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখাটা নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য একটি নিয়মিত ঘটনা। উপজেলা ছাড়িয়ে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়েও এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রেখে এসেছে।
চলতি বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (DSHE) আওতাধীন "Education Excellence Support Scheme" প্রজেক্টের অধীনে একটি বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য ছিল তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে 'Startup, Innovation Idea এবং Science Project' শোকেসিংয়ের মাধ্যমে নতুন উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটানো। এই প্রজেক্টের আওতায় নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা মিলে তৈরি করে এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন"Dropout AI Alert App"
[শিক্ষার্থীর ডেটা] ➔ [AI অ্যানালিটিক্স] ➔ [ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ] ➔ [শিক্ষক ও অভিভাবককে অ্যালার্ট]
হাইমচরের মতো উপকূলীয় ও নদীভাঙন কবলিত এলাকায় দারিদ্র্য এবং স্থানান্তরের কারণে প্রতি বছর বহু শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ে (Dropout)। এই সামাজিক সমস্যাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সমাধান করার চিন্তা থেকেই অ্যাপটির জন্ম।
১.এটি মূলত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চালিত অ্যাপ্লিকেশন।
২.এটি শিক্ষার্থীর ক্লাসে উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল, আচরণগত পরিবর্তন এবং পারিবারিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে।
৩.কোনো শিক্ষার্থীর ঝরে পড়ার সামান্যতম ঝুঁকি তৈরি হলেই অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে 'AI Alert' বা সতর্কবার্তা পাঠায়। ফলে সময় থাকতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া রোধ করা সম্ভব হয়।
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী “চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে” আয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের শোকেসিং প্রোগ্রামে যখন নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের স্টলে এই প্রজেক্টটি প্রদর্শন করা হচ্ছিল, তখন সেখানে তৈরি হয়েছিল অভূতপূর্ব আলোড়ন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একদল ক্ষুদে শিক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে কাজ করছে ,এটি দেখতে স্টলে ভিড় জমান দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীরা।
প্রদর্শনী চলাকালীন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের এই অনন্য উদ্ভাবনটি সরাসরি পরিদর্শন করেন “মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিনী ডা: জোবাইদা রহমান,মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং মাননীয় শিক্ষা উপদেষ্টা”।তাঁরা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের মুখে অ্যাপটির কার্যকারিতা শোনেন এবং এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই প্রজেক্টটিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি গেম-চেঞ্জার হিসেবে অভিহিত করেন। এবং জাতীয় পর্যায়ে “১২ তম” স্থান দখল করে এ প্রতিষ্ঠানটি
নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এই গল্পটি কেবল একটি স্কুলের সাফল্যের গল্প নয়। এটি প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বমানের উদ্ভাবন উপহার দিতে পারে। নদীভাঙনের পলিমাটিতে দাঁড়িয়ে যে তরুণেরা আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কথা বলছে, তারাই আগামী দিনের 'নতুন বাংলাদেশ'-এর মূল কারিগর।
১৯২৮ সালের সেই ছোট্ট পাঠশালাটি আজ ২০২৬ সালে এসে প্রযুক্তি ও মেধার এক অনন্য বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। নীলকমল ওছমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় তার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে আগামী দিনেও আলো ছড়িয়ে যাবে ,এটাই আজ চাঁদপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যাশা।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে