পর্দার অন্তরালে থেকেই হাজার কোটি টাকার মালিক ফ্যাসিস্টদের দোসর, তবুও আছে বহাল তবিয়তে
এ যেন রুপ কথার গল্পকেও হার মানানো এক ঘটনা। একটা সময়ে সাধারণ জীবন-যাপন করা ব্যক্তি হঠাৎ যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ। বনে গেছে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি ও গাড়ির মালিক। বিদেশে অর্থ পাচার করে সেকেন্ড হোম হিসেবে মালয়েশিয়ায় বাড়ি কিনে সেখানে মেয়েকে রেখে পড়ালেখা করিয়েছে। পোশাক পরিবর্তরেন মত গাড়ির মডেল পরিবর্তন যেন তার বাঁ হাতের ব্যাপার। এক সময়ে গ্রামের বাড়ীতে ছিল জরাজীর্ন টিনের ঘর রাতারাতি সেখানে গড়ে উঠছে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্যুইমিং পুল সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, প্রকল্প থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অত্যন্ত দূরভিসন্ধি, সুযোগ সন্ধানি, চতুর, এই টেন্ডার মাফিয়াকে টেন্ডার মেকানিজমের বস বলা হয়।
কে এই ব্যক্তি
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়ন ও গ্রামের নুরালম মল্লিক ওরফে নুরা ওরফে লাকি। বর্তমান ঠিকানাঃ বেইলী রীজ, ফ্ল্যাট নং এ/৯, বেইলী রোড, শান্তিনগর, রমনা, ঢাকা এবং ফ্যালকন স্প্রিং, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা, বাড়ি নং ১৮, রোড নং ১২. ব্লক-জে, বারিধারা, ঢাকা, মোবাইল-০১৭১১৮৯১০৩৩, ০১৬১৩৮৯১০৩৩। যিনি এক সময়ে তার সৎ ভাই আরেক টেন্ডার মাফিয়া ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বিগত ১৭বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার উয়ার্শী ইউনিয়রে কয়েকবারের চেয়ারম্যান ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামি লীগের যগ্ম সাধারন সম্পাদক মাহাবুব আলম মল্লিক ওরফে হুর মহল এর সাথে ব্যবসায় করতেন। পারিবারিক ও ব্যবসায়িক কলহ থেকে নুরালম মল্লিক ওরফে নুরা ওরফে লাকিকে ব্যবসায় থেকে বের করে দেয়। অত্যন্ত সুযোগ সন্ধানি, চতুর, টেন্ডার টেন্ডার মাফিয়া হওয়ায় এই নুরা ওরফে লাকি তার ভাইয়ের ব্যবসায় থেকে বের হয়ে জনপ্রশান মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও তৎকালিন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব ইকবাল মাহমুদ এর ভাই সাদেক মাহমুদ বকুল এর সাথে দীর্ঘ দিনের পরিচয় থেকে সখ্যতা ও ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলে। এর সূত্র ধরে কোটি কোটি টাকারতদবির বানিজ্য করে। সেই সাথে টেন্ডার বাণিজ্যও শুরু করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাদেক মাহমুদ বকুল (ফ্যালকন স্প্রিং, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলা, বাড়ি নং ১৮, রোড নং ১২. ব্লক-জে, বারিধারা, ঢাকা, মোবাইল নং ০১৭১১৫২০১৪৪) নিজেও একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ি ও গাড়ির মালিক হয়েছেন। বিভিন্ন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং, নাহিদ এ্যাডভারটাইজিং এ্যান্ড প্রিন্টিং, আর্ডেন্ট সিসটেম এবং রঞ্জি জেভি (জয়েন্ট ভেঞ্চার), তুষার এন্টারপ্রাইজ সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সাথে নেগোশিয়েট করে তাদের নামে কাজ বাগিয়ে আনে। নিয়েছেন এভাবে নিজেদের ধরা-ছোয়ার বাইরে রেখে সুকৌশলে টেন্ডার মেকানিজমের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। নিচে বিবরণীতে তুলে ধরা হলো।
বিআইডব্লিউটিএ থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণঃ
২০১৬ সালে বিআইডব্লিউটিএ এর অধীনস্ত মেঘনা-তিতাস নদীর দাউদকান্দি-হোমনা-রামকৃষ্ণপুর এবং রামচন্দ্রপুর নদী পথ এর ৪৫,৮৮,৭৫০০০/- টাকার ড্রেজিং কাজ অভিজ্ঞতা না থাকা সত্বেও সূক্ষ্ম টেন্ডার মেকানিজমের মাধ্যমে Ardent System and Ronji JV এর নামে বাগিয়ে নেয়। মেয়াদ শেষে হলেও সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে যোগসজসে কাজের বর্ধিত কাজের নাম ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে আরো ৫ কোটি টাকা তুলে নেয়। এছাড়াও ২০১৫ সালে রামপালের মংলা-গাসিয়াখালি খাল খননের ১,৯৯,৬০,০০০ টাকার ড্রেজিংয়ের কাজ একইভাবে হাতিয়ে নেয়। উক্ত কোম্পানিতে নুরালম মল্লিক ওরফে নুরা ওরফে লাকিকে ও সাদিক মাহমুদ ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে রোল প্লে করে Ardent System and Ronji JV এর নামে ব্যাংকে হিসাব খুলে উভয়ের স্বাক্ষরে সমস্ত লেনদেন ও কার্যাবলি পরিচালিত হয়। কাজ না করে অফিস ম্যানেজ করে ভূয়া বিল ভাউচার বানিয়ে অনিয়মকে নিয়মে পরিনত করে কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নেয়। এছাড়াও নিজস্ব কোন ড্রেজার না থাকায় কখনও ভাড়ায় চালিত কখনো ডিজেল চালিত স্যালো মেশিন দিয়ে বালু কাটা হতো। এ ব্যাপারে তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতি বিষয়টি পত্র-পত্রিকায় একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে।
প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণঃ
Integrated Livestock Development Project in Coastal Char Land এর প্রায় ৪০০ কোটি টাকা
Integrated Livestock Development Project in Haor areas এর প্রায় ২০০ কোটি টাকা
ILDP in 86 Disadvantaged Areas and River-side Chor in the Northern Border এর প্রায় ২০০ কোটি টাকা
উপরোক্ত প্রকল্পসমূহের মাধ্যমে গরীব ও দুস্থদের মাঝে বিনা মূল্যে হাঁস, মুরগি, ছাগল ও ভেড়া এবং এসব হাঁস, মুরগি, ছাগল ও ভেড়া লালন-পালনের জন্য ঘর নির্মাণ করে প্রদান করা হয় যার সম্পূর্ণ কাজ নুর আলম মল্লিক ওরফে লাকি টেন্ডার মেকানিজমের মাধ্যমে এবং সাবেক দুদক চেয়ারম্যানের প্রভাব খাটিয়ে আনফিট কোম্পানি (একজাতীয়/সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং, নাহিদ এ্যাডভারটাইজিং এ্যান্ড প্রিন্টিং ও তুষার এন্টারপ্রাইজ) এর নামে কাজ বাগিয়ে নেয়। প্রথমে আনফিট প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ আদায় করে নিয়ে অফিসের সাথে আতাত করে পরবর্তী প্রকাশিত সকল টেন্ডারেরশর্তাবলি টেন্ডার মাফিয়া নুর আলম মল্লিক আগেই এমনভাবে নির্ধারন করে দিতেন যাতে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান উক্ত কাজের টেন্ডারে অংশগ্রহন করতে না পারে। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে হাঁস, মুরগি, ভেড়া ও ছাগল গরীব ও দুস্থদের মাঝে বিনা মূল্যে বিতরন এবং তা পালনের জন্য ঘর বা শেড নির্মাণ বাবদ প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সকল টেন্ডার এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং, নাহিদ এ্যাডভারটাইজিং এ্যান্ড প্রিন্টিং ও তুষার এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠানের নামে হাতিয়ে নিয়ে অফিস ম্যানেজ করে ভূয়া চালান ভাউচারের মাধ্যমে নিজেরা বিল তুলে নেয়। সাদিক মাহমুদ এর ভাই দুদক চেয়ারম্যান হওয়ায় তাকে অন্তরালে রেখে সকল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন নুরালম মল্লিক ওরফে নুরা ওরফে লাকি পরিচালনা করে। যমুনা ব্যাংক পিএলসি, দিলকুশা, ঢাকা এর তৎকালিন শাখা প্রধান জনাব আনোয়ার কবিরের সাথে তাদের সুসম্পর্ক থাকায় এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সুথলি লেনদেন করার জন্য নিয়ম বর্হিভূত ভাবে নাহিদ এ্যাডভারটাইজিং এ্যান্ড প্রিন্টিং কোম্পানি থেকে নুর আলম মল্লিক এর নামে পাওয়ার অফ এ্যাটর্নি নিয়ে তিনি নিজেই উক্ত কোম্পানির নামে এ্যাকাউন্ট ওপেন করে পরিচালনা করে যার নম্বরঃ ১০০১০০০০৭৫০২৭ ও ০০০৬০২১০০২২৩২৫ যমুনা ব্যাংক পিএলসি, দিলকুশা, ঢাকা।
অন্যদিকে এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং ও তুষার এন্টারপ্রাই এর বিল পাওয়ার পর উক্ত প্রতিষ্ঠানের হিসাব থেকে নগদ অথবা সরাসরি নূর আলম মল্লিক এর মালিকাধীন Hoor and Company এর এ্যাকাউন্ট নং ০০৬০২১০০২২৫৮ যমুনা ব্যাংক পিএলসি, দিলকুশা, ঢাকা সহ অন্যান্য হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। উক্ত কাজে সঠিক ওজনের হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া প্রদান না করে কম ওজনের পশু সরবরাহ করে বিল তুলে নেয়। সুনামগঞ্জে সংসদ সদস্য পশুপ্রাণি বিতরন অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত থাকা অবস্থায় সুফলভোগীদের মাঝে শর্তাবলি অপেক্ষা কম ওজনের ছাগল-ভেড়া সরবরাহ করার সময় বিষয়টি সাংসদের নজরে এলে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ কাজ বন্ধ করে দেন এবং উক্ত ঠিকাদার কোম্পানির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেন। এ ব্যাপারে একাধিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হলেও প্রভাবশালী হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হয়নি। এছাড়া, হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়ার ঘর সঠিকভাবে তৈরি না করে নিম্ন মানের ঘর প্রদান করা হয়েছে, এমনকি অনেক জায়গায় ঘর তৈরি করে সরবরাহ না করে প্রান্তিক ভোগকারিদের শুধুামাত্র কাঠ, টিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে বিল তুলে নিয়েছে। এসব অনিয়ম-দুর্নীতি বিরুদ্ধে বিভিন্ন আঞ্চলিক পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে এবং দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় গত ০৪.০৯.২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে।
জনস্বস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণঃ
করনা মহামারি পরবর্তী সময়ে জনস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১২৪৭১১৫৯.৩০০ কোটি টাকার Construction of 24 Nos Public Sanitation and Hygiene Facilities with running Water by Installing Deep Submersible Tubewell etc. কাজ এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে আদায় করে নেয়।ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণঃ
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পূর্বে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অধীনে খাল, পুনরুদ্ধা, সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি প্রকল্পের ২৯,১৬,৭৯,৪০৯/- টাকার মান্ডা খাল খননের কাজ হাতিয়ে নেয়। ৫ই আগস্ট ২০২৪, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর উক্ত বন্ধ থাকে এবং বাতিল হয়। কিন্তু যেহেতু তারা প্রভাবশালী, তাদের দোসর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা এখনো বহাল থাকায় তাদের মাধ্যমে বাতিল হওয়া কাজটি ফিরিয়ে এনে ভুয়া বিল ভাউচার দিয়ে বিল তুলে নেয়।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমাণ
এছাড়া সমজাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন অধিদপ্তর, প্রকল্প, অফিস, ডিজিডিপি সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান (যুমনা ফার্টিলাইজার লিঃ এর থেকে মাহমুদ এ্যান্ড কোম্পানি এর নামে ২০ কোটি টাকার ক্যাটালিস্ট টিউব, ডিজিডিপি থেকে ওরিয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ এর নামে প্রায় ৫ কোটি টাকার মুগ ডাল এর কাজ) থেকে হুর এ্যান্ড কোম্পানি, ওরিয়েন্ট এন্টারপ্রাইজ, মাহমুদ এ্যান্ড কোম্পানি সহ অন্যান্য কোম্পানির নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকার কাজ টেন্ডার মেকানিজমের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে।
হাতিয়ে নেয়া অর্থের সার সংক্ষেপঃ
এম.এ ইঞ্জিনিয়ারিং এর নামে ৪০০ কোটি টাকা
নাহিদ এ্যাডভারটাইজিং এ্যান্ড প্রিন্টিং এর নামে ২০০ কোটি টাকা
তুষার এন্টারপ্রাইজ এর নামে ৩০০ কোটি টাকা
আর্ডেন্ট সিসটেম এবং রঞ্জি জেভি (জয়েন্ট ভেঞ্চার) এর নামে ৬০ কোটি টাকা
বেনামে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৪০ কোটি টাকা
এছাড়াও এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট উচ্চ মহল তদন্ত করলে তাদের আরো অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি সামনে আসবে।
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬