নদী ও সাগরবেষ্টিত দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা দীর্ঘদিন ধরেই মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। নৌপথনির্ভর এই জেলার মানুষের বহু বছরের সেই অপেক্ষার অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে নতুন মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগে।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বরিশালের রহমতপুর থেকে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে ভোলা পর্যন্ত নতুন মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে ভোলা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট কাটিয়ে এ উদ্যোগ দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় পরিবর্তন আনবে।তেঁতুলিয়া নদীর তীরে অবস্থিত ভোলা আর কীর্তনখোলা নদীর পাড়ের বরিশালের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব খুব বেশি নয়। তবে নদীবেষ্টিত অবস্থানের কারণে দুই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ দীর্ঘদিন ধরে নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। বরিশাল বা ঢাকায় যাতায়াত করতে হলে ভোলার বাসিন্দাদের ফেরি, লঞ্চ, ট্রলার কিংবা স্পিডবোট ব্যবহার করতে হয়।ঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানবাহনের চাপ এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ভোলার মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে এই যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সময় বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি বরিশালে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় ভোলা ও বরিশালের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। পরে সেই প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় দ্বীপ জেলাকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।গত ২২ আগস্ট রহমতপুর, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও ভোলা রুটে মহাসড়ক নির্মাণের মাধ্যমে ভোলাকে দেশের মূল সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।স্থানীয়দের মতে, ভোলা, মেহেন্দীগঞ্জ, হিজলা, মুলাদী ও রহমতপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সংযোগ আরও সহজ হবে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, শিল্প এবং পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।তবে মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগে আশাবাদী হলেও ভোলার মানুষের দীর্ঘদিনের আরেকটি দাবি সামনে এসেছে। সড়ক প্রকল্পের পাশাপাশি ভোলা ও বরিশালের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণের দাবিও জোরালোভাবে জানাচ্ছেন তারা।মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, ইলিশা ও বুড়াগৌরাঙ্গ নদী এবং বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত ভোলা ভৌগোলিকভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন। নৌপথই দীর্ঘদিন ধরে এই জেলার প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কার্যত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।স্থানীয়দের ভাষ্য, ভোলা গ্যাস, ইলিশ, ধান, সুপারি ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যে সমৃদ্ধ হলেও সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পুরোপুরি ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দিনের আলো ফুরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অনুভূতিও দীর্ঘদিন ধরে ভোলার মানুষের বাস্তবতা।স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর দ্বীপ জেলাটিকে দেশের মূল সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার এই উদ্যোগকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।ভোলা পৌরসভার অফিসারপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আহাদ খান ও বাবুল মিয়া বলেন, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বরিশাল কিংবা ঢাকায় নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। সময়ক্ষেপণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার কারণে অনেক পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।তাদের মতে, ভোলা থেকে মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলে চিকিৎসাসহ জরুরি প্রয়োজনে মানুষের চলাচল অনেক সহজ হবে।ভোলা চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন খাঁন বলেন, গ্যাস, ইলিশ, কৃষি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে ভোলায়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে উঠলে জেলার ইলিশ, ক্যাপসিকাম, তরমুজসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দ্রুত রাজধানী এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব হবে।তিনি মনে করেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে কৃষক ও খামারিরা তাদের পণ্যের ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।‘আমরা ভোলাবাসী’ সংগঠনের সদস্য সচিব মীর মোশারেফ অমি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন জেলার মানুষ। মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সেতু নির্মাণের দাবিটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার আহ্বান জানান তিনি।ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অ্যাডভোকেট নজরুল হক অনু বলেন, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগেও ভোলা এখনো দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। রহমতপুর, হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ হয়ে ভোলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তবে তার মতে, ভোলার দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ সমস্যার সমাধানে মহাসড়কের পাশাপাশি ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।ভোলা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে জেলার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ভোলার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে গ্যাসের ব্যবহার এবং শিল্পায়নের সম্ভাবনাও বাড়বে।তিনি বলেন, উন্নত সড়ক যোগাযোগ শুধু ভোলার জন্য নয়, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ভোলার যোগাযোগ স্থাপন এবং ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ দীর্ঘদিনের যৌক্তিক দাবি। জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করার উদ্যোগকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিক। ভোলাকে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পথ তৈরি হয়েছে।তিনি বলেন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে এবং ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি দূর হবে।তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী দিনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।সড়ক ও জনপদ বিভাগের ভোলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইদুল ইসলাম জানান, রহমতপুর, হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও ভোলা রুটে প্রায় সাড়ে ২১ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।তিনি বলেন, পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা গেলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভোলাকে জাতীয় মহাসড়ক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।দীর্ঘদিন ধরে নৌপথনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে বসবাস করতে হয়েছে ভোলার মানুষকে, নতুন এই মহাসড়ক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেই বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোলা-বরিশাল সেতুর দীর্ঘদিনের দাবিও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে জেলার মানুষ।
১৫ ঘন্টা আগে