বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
The Dhaka News Bangla

সারাদেশ

বাবার মৃত্যুতে অনিশ্চয়তায় শ্রাবন্তীর বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন

বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করার স্বপ্ন ছিল কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ইউনিয়নের মুরাদপুর পোনসাইর গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী আক্তারের। তার বাবা ষাটোর্ধ্ব ছালাম মিয়ারও ছিল একই স্বপ্ন। অভাব-অনটনের সংসারে রাত জেগে বাজার পাহারা দিয়ে উপার্জন করা অর্থে তিনি পাঁচ মেয়েকে মানুষ করার পাশাপাশি ছোট মেয়ে শ্রাবন্তীকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একটি মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ছালাম মিয়ার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন আজ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মৃত্যুকালে তিনি পাঁচ মেয়ে ও স্ত্রীকে রেখে গেছেন।স্থানীয়রা জানান , ৬০ বছর বয়সী ছালাম মিয়া স্থানীয় মুরাদপুর বাজারে বাজার পাহারাদার (নাইট গার্ড) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার সংসারে পাঁচটি মেয়ে সন্তান ছাড়া কোনো ছেলে নেই। সীমিত আয়ের মধ্যেই তিনি বড় তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুই মেয়ের পড়ালেখার দায়িত্বও তিনি সাধ্যমতো পালন করে আসছিলেন।গত ২৫ জুন বৃহস্পতিবার বিকেলে গৌরীপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চট্টগ্রামগামী লেনে কুটুম্বপুর বাসস্ট্যান্ডে বাস থেকে নামার পরপরই একটি দ্রুতগামী লরি (ভেহিকল) গাড়ি তাঁকে চাপা দিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনি মারা যান।বর্তমানে শ্রাবন্তী কুটুম্বপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যুর পর অর্থাভাবে তার ছোট বোন সেঁজুতির পড়ালেখা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে শত কষ্ট ও অভাব-অনটনের মধ্যেও আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের সহৃদয়বান মানুষের সহযোগিতায় নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে শ্রাবন্তী।শ্রাবন্তী আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, আমার স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডার হওয়া। আমার বাবারও অনেক স্বপ্ন ছিল আমাকে পড়ালেখা শিখিয়ে সরকারি চাকরিতে দেখতে। বাবা সব সময় আমাকে পড়াশোনা করতে উৎসাহ দিতেন। বাবাকে হারানোর পর আমাদের সংসারে অনেক কষ্ট নেমে এসেছে। অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। তারপরও আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই।ছালাম মিয়ার স্ত্রী রুবি আক্তার বলেন, আমার কোনো ছেলে সন্তান নেই, শুধু পাঁচটি মেয়ে। আমার স্বামীই ছিল আমাদের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তিনি বাজার পাহারা দিয়ে যে বেতন পেতেন, তা দিয়েই কোনো রকমে আমাদের সংসার চলত। স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাদের সংসার চালানোর মতো কেউ নেই। মানুষের সাহায্য-সহযোগিতায় অনেক কষ্টে দিন কাটছে। সরকার যদি আমাদের কিছু অনুদান দেয় এবং আমার মেয়ের পড়ালেখার দায়িত্ব নেয়, তাহলে শ্রাবন্তী তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে।স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ছালাম মিয়া অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মুরাদপুর বাজারে রাতের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তার স্ত্রী ও সন্তানরা আজ চরম মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে।মুরাদপুর বাজারের ব্যবসায়ী মো. আব্দুল বাতেন মেম্বার বলেন “ছালাম ভাইয়ের পরিবার বর্তমানে অসহায় অবস্থায় রয়েছে। শ্রাবন্তী একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। আর্থিক সংকটের কারণে যদি তার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, সমাজের জন্যও ক্ষতির কারণ হবে। আমরা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।পুনসাইর গ্রামের মো. ইব্রাহিম মিয়া বলেন, ছালাম মিয়া সব সময় তার মেয়েদের শিক্ষিত করার কথা বলতেন। তিনি চাইতেন অন্তত একজন মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরি করুক। তার মৃত্যুর পর সেই স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, সে জন্য সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।এলাকাবাসীর দাবি, মেধাবী শিক্ষার্থী শ্রাবন্তীর পড়াশোনা চালিয়ে নিতে সরকারি বৃত্তি, আর্থিক অনুদান কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা সহায়তা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে অসহায় পরিবারটির স্থায়ীভাবে বেঁচে থাকার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বিশেষ সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন তারা।বাবার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে এখনও পড়ার টেবিলে বসে শ্রাবন্তী। অভাব তাকে থামিয়ে দিতে চাইলেও তার চোখে এখনও জ্বলজ্বল করছে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন। এখন শুধু প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের সহানুভূতির হাত, যাতে একটি মেধার স্বপ্ন অকালেই ঝরে না যায়।

বাবার মৃত্যুতে অনিশ্চয়তায় শ্রাবন্তীর বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন