শিল্পী পথিক নবীর গাওয়া সেই অমর গানের সুর, আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ, এই খানে এক নদী ছিল জানলো না তো কেউ, নদীর জল ছিল না, কুল ছিল না; ছিল শুধু ঢেউ, আজকের দিনে সেই গানও নেই, নদীও হারিয়ে গেছে কালের বিবর্তনে। কলকলিয়ে চলতো যে নদী গাঁয়ের বধূর নূপুর ধ্বনি চিনে, সে নদী আজ মরে গেছে মোদেরই পাপের দিনে।" প্রবীণদের মুখে মুখে ফেরা এই বিষাদময় গানের পংক্তিগুলো আজ নির্মম বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে কুমিল্লার দাউদকান্দি ও চান্দিনা সীমান্ত জুড়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক কালাডুমুর নদের বুকে। একসময়ের প্রমত্তা, যৌবনা ও কল্লোলিনী এই নদটি আজ মানব সভ্যতার চরম উদাসীনতা, নির্মম নিষ্ঠুরতা এবং দূষণের শিকার হয়ে বিকলাঙ্গ প্রায়। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সমৃদ্ধ মানচিত্র থেকে আরও একটি প্রাণবন্ত নদী হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নদীটির ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব এখন শুধু সরকারি খাতা-কলমে আর স্থানীয় প্রবীণ মানুষদের স্মৃতিপটের ধূসর পাতায় বন্দি হয়ে রয়েছে।
ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লার কালাডুমুর নদীটি মূলত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিখ্যাত ও চিরচেনা গোমতী নদীর একটি অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ শাখানদী। এটি দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর এলাকা থেকে উৎপত্তি লাভ করে চান্দিনা সীমান্ত ছুঁয়ে চাঁদপুর জেলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। একসময় এই নদের রূপ ও যৌবন ছিল দেখার মতো। বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণের বর্ষা মৌসুমে নদীর দুই কূল যখন পানিতে উপচে পড়ত, তখন এর বুকে অনায়াসে চলাচল করত দূর-দূরান্ত থেকে আসা বড় বড় মালবোঝাই নৌকা, ইঞ্জিনচালিত লঞ্চ ও বিশাল কার্গো বোট। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি পণ্য পরিবহন এবং যোগাযোগের প্রধান লাইফলাইন বা ধমনী হিসেবে কাজ করত এই কালাডুমুর নদ। কিন্তু সময়ের নির্মম পরিহাস, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং দীর্ঘদিনের চরম অবহেলায় নদীর সেই চিরচেনা রূপ আজ পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। প্রমত্তা নদীটি এখন শুকিয়ে কোথাও সরু ড্রেন, আবার কোথাও নোংরা ও মরণাচ্ছন্ন ডোবায় পরিণত হয়েছে। বর্ষায় সামান্য পানি জমলেও শুষ্ক মৌসুম আসার সাথে সাথেই নদীটি মানচিত্র থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে কালাডুমুর নদটি এখন স্থানীয় হাট-বাজারের আবর্জনার প্রধান ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গৌরীপুর ও ইলিয়টগঞ্জ বাজার এলাকার সমস্ত কঠিন বর্জ্য, প্লাস্টিক ও ময়লা-আবর্জনা প্রতিদিন প্রকাশ্যে এই নদে এনে ফেলা হচ্ছে। বাজারের পলিথিন, ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও বর্জ্য পদার্থ জমে জমে নদের বুকে এখন বিশাল স্তূপ তৈরি হয়েছে, যা নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ও গতিপথকে সম্পূর্ণরূপে অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর ও স্থায়ী খনন কাজ না হওয়ায় নদীর তলদেশ এখন বালি, পলি আর ঘন কচুরিপানায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নদীটি তার ভেতরের প্রাণশক্তি হারিয়ে এখন এক মৃতপ্রায় মরা খালে পরিণত হয়েছে।
কালাডুমুর নদটি কেবল একটি সাধারণ জলাশয় বা জলপথ নয়, এটি কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার অন্তত চার উপজেলার হাজার হাজার সাধারণ কৃষকের জীবন-জীবিকার মূল চালিকাশক্তি। স্থানীয় কৃষি জমিতে মৌসুমি হরেক রকমের শাকসবজি ও বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকদের সেচের পানির একমাত্র প্রাকৃতিক উৎস এই নদ। নদীটি ভরাট হয়ে শুকিয়ে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের চাষাবাদ এখন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেচের পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদী পড়ে থাকছে। একই সাথে নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় দেশীয় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার ওপর।
সংশ্লিষ্ট সরকারি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কালাডুমুর নদের মোট ২৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের মধ্যে গৌরীপুর থেকে ইলিয়টগঞ্জ পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার অংশ কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে খনন করা হয়েছিল। কিন্তু খনন-পরবর্তী সময়ে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও কঠোর তদারকি না থাকায় এবং জনগণের অসচেতনতায় তা পুনরায় ময়লা, আবর্জনা ও কচুরিপানায় ভরাট হয়ে যায়। স্থানীয়দের দাবি, ভরাট হওয়া এই অংশটি যদি আবারও বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক পদ্ধতিতে পুনঃখনন করা হয়, তবে নদসংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় পঞ্চাশ হাজার বিঘা কৃষি জমিতে অনায়াসে সারা বছর সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অন্তত সাড়ে বারো লাখ মণ অতিরিক্ত বোরো ধান উৎপন্ন করা সম্ভব, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেবে। একই সাথে নদীটি ফিরে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন প্রাণশক্তি এবং হাজারো কৃষকের চোখে-মুখে ফুটে উঠবে আগামী দিনের আশার আলো।
এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষ মনে করেন, পরিবেশের ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে হলে যেকোনো মূল্যে এই কালাডুমুর নদকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। জনবহুল বাজারের ময়লা-আবর্জনা ফেলে নদীর চলমান পথ বন্ধ করে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও পরিবেশবিধ্বংসী অপরাধ। স্থানীয় ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, নদীটি আবার প্রাণ ফিরে পেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যাবে এবং মুখে ফুটবে চওড়া হাসি। তাই কালাডুমুর নদে অনতিবিলম্বে ময়লা ফেলা বন্ধ করা, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে সীমানা নির্ধারণ করা এবং দ্রুত গৌরীপুর থেকে ইলিয়টগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় টেকসই পুনঃখনন করে নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও চিরচেনা গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিকট জোর দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের ভুক্তভোগী জনগণ।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে