আকাশজুড়ে তামাটে মেঘের ঘনঘটা, থেকে থেকেই গুরুগুরু ডাক আর মেঘ-বালিকার দল জানান দিচ্ছে বর্ষার চিরন্তন আগমনী বার্তা। জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহে পুড়ে যাওয়া তপ্ত ধরণী যখন চাতকের মতো ব্যাকুল হয়ে একটুখানি শীতলতার জন্য অপেক্ষা করছিল, তখনই যেন আকাশ ভেঙে আশীর্বাদ হয়ে নেমে এসেছে আষাঢ়ের রিমঝিম বৃষ্টি। প্রকৃতির এই পরম সিক্ততার দিনে এক অনন্য ও মনোমুগ্ধকর সুসংবাদ নিয়ে হাজির হয়েছে বর্ষার চিরন্তন রাজপুত্র, কদম ফুল।
গ্রামীণ মেঠোপথ থেকে শুরু করে শহরের যান্ত্রিক ইট-পাথরের ধূসর দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোতে এখন কদমের মেলা। সবুজ পাতার নিবিড় আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে শত শত কদম। হলুদ-সাদার মিশ্রণে তৈরি এই গোলগাল ফুলগুলো যেন প্রকৃতির বুকে এক একটি চিরসবুজ হাসিমুখ, যা দেখার পর যে কোনো ক্লান্ত পথিকের মনে এক নিমেষে এক চিলতে শান্তির স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে যায়।
কদম ফুল মানেই তো বর্ষার প্রথম প্রেম, আষাঢ়ের প্রথম স্মারক। বছরের অন্য দিনগুলোতে কদম গাছগুলো খুব একটা চোখে না পড়লেও, আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি পড়ার সাথে সাথেই তারা যেন নতুন যৌবন ফিরে পায়। মেঘলা দিনে যখন চারপাশটা কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন ও বিষণ্ন দেখায়, ঠিক তখনই কদম গাছগুলো যেন এক জাদুকরি আলোয় সেজে ওঠে। সবুজ পাতার খাঁজে খাঁজে যখন ডালপালা আলো করে কদম ফুল ফোটে, তখন মনে হয় যেন প্রকৃতির এক বিশাল ক্যানভাসে কেউ পরম মমতায় হলুদ আর সাদা রঙের আলপনা এঁকে দিয়েছে।
এই ফুলটির গঠনশৈলীও ভারী অদ্ভুত আর চমৎকার। মাঝখানে নিটোল গোল মাংসল অংশ, আর তার চারপাশ ঘিরে পরম আস্থার সাথে দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য সাদা ও হলুদাভ নরম রেণু। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন গাছে গাছে ছোট ছোট সোনার বল দোল খাচ্ছে। আর বৃষ্টির ফোঁটা যখন এই কদম রেণুর ওপর আছড়ে পড়ে, তখন ফুলটি থেকে যে এক ধরনের মৃদু, মিষ্টি ও মাটির সোঁদা গন্ধযুক্ত সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তা যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের মনকে এক লহমায় আকুল ও উদাসী করে তোলে।
বাঙালি সংস্কৃতি, আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সাহিত্যের সাথে কদম ফুলের সম্পর্ক বহু পুরনো এবং গভীর। বর্ষার সামগ্রিক সৌন্দর্য ও রূপ কদম ফুল ছাড়া যেন একেবারেই অপূর্ণ এবং বিবর্ণ রয়ে যায়। কবি-সাহিত্যিকরা যুগে যুগে কদম ফুলকে নিয়ে কতশত কালজয়ী কবিতা, গল্প আর গান রচনা করেছেন। বিরহী মন কিংবা প্রেমের চিরায়ত নীরব প্রকাশ সবখানেই কদম ফুলের উপস্থিতি প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। গ্রামীণ জনপদে কাটানো শৈশবের কত শত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে থাকে এই ফুলটিকে ঘিরে। আষাঢ়ের অবিশ্রান্ত বৃষ্টির মাঝে দলবেঁধে কদম গাছ থেকে ফুল পাড়ার অবাধ্য আনন্দ কিংবা সেই সংগৃহীত ফুল দিয়ে পড়ার টেবিল বা শোবার ঘর সাজানোর ব্যাকুলতা গ্রামীণ জীবনের এক চিরায়ত মনকাড়া দৃশ্য। বর্তমানের আধুনিক নাগরিক জীবনে গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমলেও, কদমের প্রতি মানুষের চিরাচরিত আদিম ভালোবাসা কিন্তু বিন্দুমাত্র কমেনি।
বর্ষার এই দিনগুলোতে ঢাকার ফুটপাতে, মোড়ে মোড়ে বা জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির জানালার পাশে ছোট ছোট শিশুদের হাতে এক গুচ্ছ কদম ফুলের তোড়া বিক্রি করতে দেখা যায়, যা প্রমাণ করে যান্ত্রিকতার নির্মম ভিড়েও কদম ফুল তার চিরন্তন আবেদন হারায়নি।
প্রকৃতির এই অনুপম সৃষ্টি কদম শুধু চোখের আরাম বা মনের শান্তিই দেয় না, এটি চারপাশের পুরো পরিবেশকেও এক অদ্ভুত সতেজতা ও প্রাণময়তায় ভরিয়ে তোলে। গ্রীষ্মের তীব্র রুক্ষতায় যখন প্রকৃতি প্রায় বিবর্ণ ও ধূলিধূসরিত হয়ে পড়েছিল, তখন কদমের এই চোখ জুড়ানো প্রস্ফুটন যেন এক নতুন আশার বাণী শোনায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমস্ত জীর্ণতা ও মলিনতা পেরিয়ে প্রকৃতি আবারও সুন্দর, সবুজ ও সতেজ হয়ে উঠতে পারে। সকালবেলার কাঁচা রোদে ভেজা কদম কিংবা বিকেলের হালকা আলোয় দুলতে থাকা কদম ফুলের রূপ মানুষের সারাদিনের ক্লান্তি ও কর্মব্যস্ততার অবসাদ দূর করার জন্য যথেষ্ট। তাই তো খবরের কাগজের শেষ পাতায় আজ যান্ত্রিকতার কোলাহল ছাপিয়ে প্রকৃতির এই অনন্য সুসংবাদ। চারপাশের নানা জটিলতা, হতাশা আর নাগরিক ব্যস্ততার মাঝে গাছে গাছে হাসতে থাকা এই কদম ফুল আমাদের একটু থামতে বলে, একটু প্রকৃতির কাছাকাছি এসে বুক ভরে শ্বাস নিতে বলে।
এই বর্ষায় কদমের সেই স্নিগ্ধ সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি মানুষের মনে, বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাক সব বৈরিতা,প্রকৃতির এই পরম উপহারে মেতে উঠুক বাংলার প্রতিটি প্রাণ।

শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে