মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া গুলি পেটে নিয়েই দীর্ঘ ৫৫ বছর কাটিয়েছেন নেত্রকোনার মন্নাস আলী। অবশেষে চিকিৎসকদের সফল অস্ত্রোপচারে শরীর থেকে বের করা হয়েছে সেই গুলি।
নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামের বাসিন্দা মন্নাস আলী (৭৫) মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে আহত হন। আর্থিক সংকট ও অস্ত্রোপচার নিয়ে ভয়ের কারণে দীর্ঘদিন শরীরে গুলিটি বহন করেই জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের একটি দল প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার করে তার শরীর থেকে গুলিটি সফলভাবে অপসারণ করেন। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুর্গাপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প ছিল। সে সময় গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার হাতে তিন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর প্রতিশোধ নিতে আশপাশের গ্রামগুলোতে অভিযান চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। হামলার সময় ঘরে আগুন দেওয়া, নির্বিচারে গুলি চালানোসহ ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। এতে বহু মানুষ নিহত হন, আবার অনেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
সেই সময় পালানোর চেষ্টা করার সময় পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি মন্নাস আলীর পেটে বিদ্ধ হয়। কিন্তু দারিদ্র্য এবং চিকিৎসার ব্যয় বহনের অক্ষমতার কারণে তিনি কখনো গুলিটি অপসারণ করতে পারেননি। সময়ের সঙ্গে বিষয়টি অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মন্নাস আলীর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এরপর স্থানীয়দের উদ্যোগে তাকে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।
মন্নাস আলীর ছেলে আবুল হোসেন বলেন, "আমার বাবা প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। টাকার অভাবে আমরা চিকিৎসা করাতে পারিনি। বাবাও গুলি বের করার বিষয়ে ভয় পেতেন। সবার সহযোগিতায় আজ তার শরীর থেকে গুলিটি বের করা হয়েছে। আমরা সবার কাছে দোয়া চাই।"
পুত্রবধূ হামিদা খাতুন বলেন, "আমার শ্বশুর সব সময় বলতেন, তার শরীরে একটি গুলি রয়েছে। আজ অস্ত্রোপচারের পর আমরা নিজের চোখে সেই গুলিটি দেখলাম।"
অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেওয়া আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হান বলেন, স্থানীয় বাসিন্দা মোশারফ নামে এক যুবক শুক্রবার মন্নাস আলীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি অপসারণ করা হয়।
তিনি জানান, উদ্ধার হওয়া গুলির বিষয়ে পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। মন্নাস আলীকে আরও তিন থেকে চার দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে