কঠোরতার আড়ালে নীরব ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক বাবা। "সোহাগ করা তারই সাজে, শাসন করে যেজন" কথাটি বাবাদের ক্ষেত্রেই শতভাগ সত্য। মুখে ভালোবাসা প্রকাশ না করলেও সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নীরবে নিজেদের সব সুখ বিসর্জন দেন। সময়ের পরিক্রমায় বাবার বয়স বাড়ে, আর মাথার ওপর থেকে এই ছায়া সরে যাওয়ার ভয় সন্তানকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কারণ, বাবা ছাড়া এই পৃথিবীতে কতটা কোণঠাসা হয়ে বাঁচতে হয়, তা কেবল বাবাহীন সন্তানই জানে। বাবাদের এই শাসন, ত্যাগ ও না-বলা ভালোবাসা নিয়েই শিক্ষার্থীদের কিছু আবেগঘন অভিব্যক্তি ও মতামত সংগ্রহ করেছেন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী তৈয়বা খানম।
বাবা বটবৃক্ষ, বিপদে বর্ম, ব্যথায় বন্ধু
বাবা শব্দটা উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা বিশাল বটগাছ। যে গাছের ছায়া আছে, অথচ কোনো অভিযোগ নেই। রোদ-ঝড়-বৃষ্টি সব নিজের ডালে নিয়ে আমাদের মাথার ওপর শান্তির আকাশ ধরে রাখেন তিনি। বিপদে বাবা বর্ম হয়ে দাঁড়ান। স্কুলের ফি, হাসপাতালের বিল, চাকরির টেনশন, জীবনের সব আঘাত প্রথমে তাঁর বুকেই লাগে। আমরা টেরও পাই না। মুখে বলেন, "আমি আছি তো।" এই তিনটি শব্দই আমাদের সবচেয়ে বড় সাহস। তাঁর ছেঁড়া স্যান্ডেল, পুরোনো শার্টের পকেট জানান দেয়, নিজের জন্য বাঁচেননি কখনো। আবার ব্যথায় বাবাই সবচেয়ে কাছের বন্ধু। রেজাল্ট খারাপ? চাকরি হলো না? প্রেম ভাঙল? মা বকবে ভেবে যে কথাটা লুকাই, বাবার কাছে গিয়ে ঠিকই বলে ফেলি। তিনি ধমক দেন না, চুপচাপ কাঁধে হাত রাখেন। সেই স্পর্শেই অর্ধেক কষ্ট উবে যায়। বাবারা ‘ভালোবাসি’ বলেন না। তাঁরা রাত জেগে ফ্যানের সুইচ অফ করেন, না খেয়ে টিফিনের টাকা দেন, অসুখ লুকিয়ে অফিস করেন। বাবা মানেই বুকভরা বাতাস। তিনি থাকলে পৃথিবীটা সহজ লাগে। তিনি না থাকলে বসন্তও বেরঙ। বাবা দিবস মানে একদিনের ফেসবুক পোস্ট না। বাবা দিবস মানে প্রতিদিন তাঁর জন্য ৫ মিনিট বরাদ্দ রাখা। ফোনে জিজ্ঞেস করা, "প্রেসারের ওষুধ খেয়েছো?" ছুটির দিনে তাঁর পছন্দের মাছটা বাজার থেকে আনা। বটবৃক্ষের শেকড়ে পানি দিতে হয়। নইলে একদিন হুট করে ছায়াটা সরে যায়। আর তখন আফসোস ছাড়া কিছু থাকে না। তাই বর্মটাকে, বন্ধুটাকে, বটবৃক্ষটাকে যত্ন করি এখন থেকেই। ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট তারিখ ছাড়াও বাবাকে মনে করা যায় সময়-অসময়ে।
মুহাম্মদ শাফায়াত হুসাইন, শিক্ষার্থী, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, কুষ্টিয়া।
অনুচ্চারিত ভালোবাসা ও বাবার যত্ন
বাবা, যাকে কখনো বলা হয়নি, আমার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম তুমি। ছোটবেলায় তোমার শাসনকে ভয় পেয়েছি, অভিমান করেছি, কখনো কখনো তোমাকে ভুলও বুঝেছি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করেছি, আমার হাসির আড়ালে তোমার অগণিত ত্যাগ লুকিয়ে ছিল। সংসারের হাজারো চাপ, ক্লান্তি আর অপূর্ণতা বুকে নিয়েও তুমি আমাদের জন্য একটুখানি স্বস্তির পৃথিবী গড়ে দিতে চেয়েছ। আজও অনেক কথা বলা হয় না। বলা হয় না, তোমার কাঁধে ভর করেই আমি জীবনের পথ চিনেছি। বলা হয় না, আমার প্রতিটি সাফল্যে তোমার রক্ত জল করা পরিশ্রম মিশে আছে। আজ বুঝি, পৃথিবী আমাকে যত কিছুই দিক না কেন, তোমার মতো একজন বাবা পাওয়াই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। জীবনের সমস্ত অর্জন এক পাশে রাখলেও, তোমার মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার সৌভাগ্যের কাছে সেগুলো ম্লান হয়ে যায়। বাবাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। বাবা আছে বলেই তো প্রতিটি দিন নিরাপদ, প্রতিটি স্বপ্ন পূরণের ভরসা পাই। ভালো থেকো বাবা, শুভ বাবা দিবস।
তাসনিয়া তাবাসসুম, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
সন্তানের জীবনের প্রথম সুপারহিরো বাবা
ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে গুটি গুটি পায়ে হাঁটা কিংবা তাঁর কাঁধে চড়ে বিস্ময়ভরা চোখে পৃথিবীকে দেখার মধ্য দিয়েই বাবার প্রতি গভীর ভালোবাসার জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্তান বুঝতে শেখে, বাবা কীভাবে নিজের স্বপ্ন, স্বাচ্ছন্দ্য আর সুখ বিসর্জন দিয়ে তাকে জীবনের সব কঠিন বাস্তবতা থেকে আগলে রাখেন। তিনি পরিবারের নির্ভরতার প্রতীক, নীরব যোদ্ধা। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই শক্ত মানুষটিও ক্লান্ত হয়ে পড়েন, অল্পতেই হাঁপিয়ে যান। তখন প্রয়োজন হয় সন্তানের একটু সময়, যত্ন ও ভালোবাসার। কারণ শেষ বয়সে তাঁরা চান, যে সন্তানকে ছোট্টবেলা থেকে আগলে রেখেছেন, যার গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচ আসতে দেননি, সেই সন্তান যেন তাঁকে একটু সময় দেয়, একটু মমতার স্পর্শ দিয়ে আগলে রাখে। তাই বাবার সঙ্গে গল্প করুন, হাঁটতে যান, একসঙ্গে খাবার খান, তাঁর অনুভূতির মূল্য দিন। ছোটবেলার মতো তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলুন, "ভালোবাসি বাবা"। কারণ, বাবা হলেন একটি বাড়ির ছাদের মতো, যিনি নিজে পুড়ে সন্তানদের ছায়া দেন, অথচ মুখ ফুটে কিছু বলেন না। একজন বাবা হয়তো অল্প সময়ের জন্য সন্তানের হাত ধরে রাখেন, কিন্তু হৃদয় দিয়ে চিরকাল তাদের আগলে রাখেন।
ফাহিমা আক্তার, শিক্ষার্থী, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, ঢাকা।
ভালোবাসার পরম মহাকাব্য বাবা
পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ ও নীরব আশ্রয়ের নাম বাবা। তিনি তপ্ত দুপুরের তীব্র দাহে বুক পেতে দেওয়া এক পরম শীতল বটবৃক্ষ। নিজের সমস্ত সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে তিনি পুরো পরিবারকে এক অদৃশ্য স্নেহের চাদরে আগলে রাখেন। ছোটবেলায় যে হাত ধরে হাঁটতে শিখেছি, আজ জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁর আদর্শই আমার পথচলার মূল শক্তি। বাবার কঠোর শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক সমুদ্র দরদ, আর ঘামে ভেজা শার্টের প্রতিটি সুতোয় বুনে রাখা থাকে সন্তানের সুখের গল্প। বাবা, তুমিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পুরুষ। তোমার ঋণ শোধ করার সাধ্য আমার নেই। তোমার প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধা, অতল ভালোবাসা ও আজীবন কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহর দরবারে আকুল ফরিয়াদ, তিনি যেন তোমাকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করেন। আর যে বাবারা ওপারে চলে গেছেন, আল্লাহ যেন তাঁদের জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। বাবারা ভালো থাকলেই আমাদের এই চেনা পৃথিবীটা সুন্দর আর নিরাপদ হয়ে ওঠে।
আশিক বিন আলম সোহাগ, শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম কলেজ, চট্টগ্রাম।
যাপিত জীবনে শক্তি ও নির্ভরতার ছায়া বাবা
বাবা আমার যাপিত জীবনের নিঃস্বার্থ চিন্তা-ভাবনা আর নৈতিক আদর্শের কপাট খুলে দিয়েছেন। বয়সের সংখ্যা যতই বাড়ছে, ততই বাবার মানে কী তা ভীষণভাবে টের পাচ্ছি। জীবনপথে আমার না মানা বাবার দামি দামি কথাগুলো যখন বাস্তবতার কঠিন পর্দায় নিখুঁতভাবে দেখতে পেয়েছি, তখন থেকেই যেন বাবাকে সচেতন মনে আরও যত্ন করে চিনতে শুরু করেছি আর বাবার ত্যাগগুলোকে আপন করে লালন করতে চেয়েছি। আমার আজকালকার নিদারুণ দুঃখ হচ্ছে চোখের সামনে বাবা-মায়ের সুস্থ, সুন্দর, রঙিন দিনগুলো হারাতে দেখা। বাবার বয়স বাড়া, অসুখ আর অসুস্থতায় হাসপাতাল থেকে বাড়ি আর বাড়ি থেকে হাসপাতালের গণ্ডিকে আপন করে নিতে দেখা। ইশ, কী নির্মম সময়! তবুও বাবা দিবসে প্রত্যাশা, সন্তান হিসেবে ভুল আর মন্দের প্রাচীর ভেঙে নিজেকে সাজিয়ে সফলতার আনন্দ চত্বরে বাবার আঙুল ধরে ছোটবেলার মতো হাঁটা। আর ভরসার হাত দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে পারা, "বাবা, আমি তো আছি।" সন্তানদের সেই দিন আসার আগ পর্যন্ত বাবা নামের বটবৃক্ষ ভালো থাকুক, বেঁচে থাকুক, এটাই কেবল চাওয়া।
নুসরাত জাহান জেরিন, শিক্ষার্থী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আইন কলেজ।
বাবারা যুগে যুগে সন্তান হয়ে বেঁচে থাকুক
বাবা মানে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও নির্ভরতার প্রতীক। বাবাদের ঘর্মাক্ত শরীর এক সুন্দর জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাবাদের দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে লীন হয়ে যায় তাঁদের সব চাওয়া-পাওয়া। তাঁরা গোটা পরিবারের এক অনন্ত প্রাণ। পরিবারের স্বার্থে তাঁরা জীবনকে বিলিয়ে দেন। বাবারা ভোরের সূর্য উদিত হওয়ার আগেই ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং ফিরে আসেন গোধূলি নামার পর। এই যে বেরিয়ে গেলেন, তারপর সারাটা দিন অমানুষিক শারীরিক কিংবা মানসিক পরিশ্রম করে ঘরে ফেরেন ক্লান্ত প্রাণ নিয়ে। ঘরে ফিরেও বাবা তাঁর সন্তানদের আদর করে, ভালোবেসে, স্নেহ করে বাবার কৃতিত্ব জানান দেন। সন্তান মানুষ হওয়ার পেছনে মায়েদের পাশাপাশি বাবারাও সমান অংশীদার। বাবারা তাঁদের মুখের শুকনো হাসিকে লুকিয়ে রেখে নরম হৃদয়ানুভূতির মধ্য দিয়ে পরিবারের ভারসাম্য বজায় রাখেন। এত ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও বাবারা একসময় বৃদ্ধ হয়ে যান, আকাশের নীলিমায় বিলীন হয়ে যান। বাবার সন্তানরা সংসার পাতে, পর্যায়ক্রমে তারাও সন্তানের জন্ম দেয়। তখন সেই বাবারাই আবার সন্তান হয়ে বেঁচে থাকেন।
জি. সি. দেবনাথ, শিক্ষার্থী, আলমগীর মনসুর (মিন্টু) মেমোরিয়াল কলেজ, ময়মনসিংহ।
শুভ্র/

রোববার, ২১ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুন ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে