মেঘনাপাড়ের উপজেলা চাঁদপুরের হাইমচরে লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। অধিবাসীদের অধিকাংশই কৃষি ও মৎস্য আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
বিশেষ করে এই উপজেলা পান চাষের জন্য অন্যতম। এবার ২৩৫ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে।
এই আবাদে জড়িত চাষিরা বছরজুড়েই এ কাজে ব্যস্ত থাকেন। আবাদের উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে পানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকদের।
কৃষি অফিস বলছে, তারা কৃষকদের কারিগরি সহযোগিতা করে আসছে।
সম্প্রতি উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে পানবরজের মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে দুটি ইউনিয়নের অবস্থান মেঘনার পূর্বপাড়ে। এসব এলাকার অধিকাংশ গ্রামেই রয়েছে পানের বরজ। পানের লতা থেকে কয়েক দশক ধরে পান উৎপাদন হয়। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। আর পানের ফলন বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয় সার ও খৈল। শীত মৌসুম ছাড়া অধিকাংশ সময়ই পানের উৎপাদন স্বাভাবিক থাকে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
উত্তর আলগী ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামের উপজেলা সদর সড়কে রয়েছে বড় ধরনের পানের পাইকারি বাজার। সপ্তাহের প্রতি মঙ্গলবার এখানে হাট বসে। এর আগে বরজমালিকরা নিজেদের এলাকায় পান সাজিয়ে হাটে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করে রাখেন। জেলার অন্য উপজেলা থেকে পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা এখান থেকে পান কিনে বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে বিক্রি করেন।
মহজমপুর গ্রামের পানচাষি সিরাজুল ইসলাম জানান, ৪০ শতাংশ জমিতে তার পানের বরজ রয়েছে। ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টিতে বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু সেই বিনিয়োগের লোকসান এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তার প্রত্যাশা, পান বিক্রিতে ভালো দাম পেলে আগের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারবেন।
একই এলাকার চাষি সামছুদ্দিন বলেন, বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পানের উৎপাদন ভালো হয়। কিন্তু এ সময় স্থানীয় বাজারে পানের দাম কম থাকে। কারণ, বরিশাল, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পান চাঁদপুরে আমদানি হওয়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পান কম দামে বিক্রি করতে হয়। অন্যদিকে শীত মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের প্রকোপ বাড়ে। ফলে দুই মৌসুমেই চাষিদের সামনে থাকে ভিন্ন ধরনের সংকট।
দক্ষিণ মহজমপুর গ্রামের পানচাষি আব্দুর রহমানের অভিযোগ, উৎপাদিত পানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। পাইকারি বাজারে প্রতি বিড়া পান বিক্রি করতে হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। অথচ একই পান খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিকবার হাতবদলের কারণে দামের বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এর সুবিধা ভোগ করছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
একই এলাকার চাষি সোলাইমান বলেন, পান উৎপাদনে প্রতিনিয়ত খরচ বাড়ছে। কীটনাশকের দাম বেড়েছে। প্রতি কেজি সার কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দরে। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। ফলে বরজের পরিচর্যা ও পান সংগ্রহে শ্রমিক নিয়োগ করতে গেলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। পূর্বপুরুষরা পান চাষ করতেন বলেই তাঁরাও এ পেশায় রয়েছেন। কিন্তু বাড়তি খরচের তুলনায় বিক্রিমূল্য কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।
শ্রমিকদের মজুরি বেশি হওয়ার কারণে এখন চাষিরা নিজেদের আবাদে নিজেরাই শ্রম দিচ্ছেন। হাটের দিনের আগেই বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখেন। এরপর সপ্তাহের মঙ্গলবার এলাকার নির্দিষ্ট বাজারে এসব পান বিক্রি করেন। এ ছাড়া পাইকারি পান প্রতিদিনই বিক্রি হয়।
হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার জানান, উপজেলার ২৩৫ হেক্টর জমিতে ২৭২ পানের বরজ রয়েছে। এই আবাদে জড়িত রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার কৃষক। প্রতিবছর কমপক্ষে ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়। উৎপাদন ঠিক রাখতে কৃষকদের সব সময় কারিগরি পরামর্শ দিয়ে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বরাদ্দ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনতে পারছেন না।

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে