মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
The Dhaka News Bangla

সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে এখন উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে: আখতার হোসেন

সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে এখন উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে: আখতার হোসেন
ছবি: সংগ্রহীত

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। কিন্তু বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, “সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে বরং আরও উল্টো পথে তাদের পা বাড়িয়েছে।”

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।

আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলে, অভিযোগ মিথ্যা হলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, “আমরা একটা ফেয়ার সিস্টেম বাংলাদেশে চাই। একটা জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রটা আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধুমাত্র আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়, সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে নতুন করে আইনগুলো প্রণয়ন করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান খসড়া আইন এভাবেই সংসদে পাস হলে মানবাধিকার সুরক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে যাবে। “অতীতে তো বাহিনীগুলো গুম করত, মানবাধিকার লঙ্ঘন করত, তারা দায়মুক্তি পেত। তো সামনেও কি আমরা এরকম দেখতে চাই?”

তিনি বলেন, অতীতের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনা উচিত নয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। 

আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, “আমরা আজকে এখানে এইভাবে কথা বলতে পারছি—এটা একটা বিশাল ব্যাপার এবং এটাকে ভুলে গেলে চলবে না।” স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি এবং রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে, আমরা যদি ইনডেক্সটা দেখি… সেখানে সবচেয়ে নিচে এখন বাংলাদেশ।” বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশে স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে যদি দেশ চলে, তাহলে তো ওই কুকুর ওভাবেই নড়ছে এবং লেজ তার মতো করে ঠিকই নাড়াচ্ছে।”

শহীদুল আলম নিরাপত্তা বাহিনী সংক্রান্ত অভিযোগে এনএইচআরসির স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা বহাল, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে—এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, রাজাকার-নন-রাজাকারসহ নানা বিতর্ক সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। তার মতে, এসব বিতর্কের কারণে রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা ও মানুষের অধিকার-প্রাপ্তির বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয়। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না। বিশেষ করে গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছে দেওয়া নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো খাসলত বদলায় না কেন, এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না। এর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহিতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে অধিকার না দিলে তাকে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রের সংকট কাটাতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ক্ষমতার কাঠামো আলাদা করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।

আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই অমরত্বের ধারণাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পথ তৈরি করে। তাই শুধু নতুন রাজনৈতিক দল বা নতুন নেতৃত্ব এলেই হবে না; রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে নতুনরাও পুরোনোদের মতো হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “জাতিগত খাসলত যদি না বদলায়, তাহলে যা কিছু নতুন তাকে পুরাতন বলিয়াই মনে হবে।”

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তা সরকারকে জবাবদিহি করতে পারবে না। গত ১৫-১৬ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাই সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “আপনারা ভোটের আগে বলে আসছেন, আপনারা ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করবেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন করবেন, মানবাধিকার স্বাধীন করবেন। এটাও আছে নির্বাচন ইশতেহারে যে মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হবে এবং এটাকে একটা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মেনে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তো একটা কথাও তো আপনারা মানছেন না।”

তিনি আরও বলেন, পুরোনো মানবাধিকার ও গুম আইন বাতিলের সময় নতুন ও আরও ভালো আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান খসড়া দেখে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের কথা আমাদের ১০০ বার, হাজার বার বলতে হবে।”

বিষয় : এনসিপি আখতার হোসেন

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে

The Dhaka News Bangla

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬


সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে এখন উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে: আখতার হোসেন

প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের আগের অধ্যাদেশগুলো বাতিল করেছে। কিন্তু বর্তমান খসড়া আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্বও এমন বাহিনীর হাতে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ থাকতে পারে। তিনি বলেন, “সরকার আরও ভালো আইন আনার কথা বলে বরং আরও উল্টো পথে তাদের পা বাড়িয়েছে।”মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৩টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির আয়োজনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ খসড়া আইন, ২০২৬: আইনি পর্যালোচনা ও করণীয় নির্ধারণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন তিনি।আখতার হোসেন বলেন, গুমের ভুক্তভোগী কোনো পরিবার অভিযোগ করতে গেলে, অভিযোগ মিথ্যা হলে পাঁচ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ফলে গুমের ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারকে ভয় দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, “আমরা একটা ফেয়ার সিস্টেম বাংলাদেশে চাই। একটা জবাবদিহি চাই। বাংলাদেশের গণতন্ত্রটা আমরা সামনের দিকে নিয়ে যেতে চাই।” তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধুমাত্র আমলা ও বাহিনীর মতামতের ভিত্তিতে নয়, সাধারণ নাগরিকদের মতামতকে ধারণ করে নতুন করে আইনগুলো প্রণয়ন করতে হবে।তিনি আরও বলেন, বর্তমান খসড়া আইন এভাবেই সংসদে পাস হলে মানবাধিকার সুরক্ষায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, বাংলাদেশ আবার পিছিয়ে যাবে। “অতীতে তো বাহিনীগুলো গুম করত, মানবাধিকার লঙ্ঘন করত, তারা দায়মুক্তি পেত। তো সামনেও কি আমরা এরকম দেখতে চাই?”তিনি বলেন, অতীতের মতো দায়মুক্তির সংস্কৃতি আর ফিরিয়ে আনা উচিত নয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত করতে হবে। আলোকচিত্রী, লেখক ও মানবাধিকার কর্মী শহীদুল আলম বলেন, “আমরা আজকে এখানে এইভাবে কথা বলতে পারছি—এটা একটা বিশাল ব্যাপার এবং এটাকে ভুলে গেলে চলবে না।” স্বৈরাচার চলে যাওয়ার পর একটি ভিন্ন বাংলাদেশ পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্বশীল রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি এবং রাজনীতিবিদরা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কথা যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করা জনগণের দায়িত্ব।তিনি বলেন, “বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে, আমরা যদি ইনডেক্সটা দেখি… সেখানে সবচেয়ে নিচে এখন বাংলাদেশ।” বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশে স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “নিরাপত্তা বাহিনীর কারণে যদি দেশ চলে, তাহলে তো ওই কুকুর ওভাবেই নড়ছে এবং লেজ তার মতো করে ঠিকই নাড়াচ্ছে।”শহীদুল আলম নিরাপত্তা বাহিনী সংক্রান্ত অভিযোগে এনএইচআরসির স্বাধীন তদন্ত ক্ষমতা বহাল, কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা রক্ষা এবং গুম আইনের দুর্বলতা সংশোধনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, নতুন সরকার অতীতের পথ থেকে সরে এসেছে—এটি শুধু কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, একটি জাতি বা রাষ্ট্রের একটি শক্ত আদর্শগত ভিত্তি প্রয়োজন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও বিভাজনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পরও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, রাজাকার-নন-রাজাকারসহ নানা বিতর্ক সমাজে বিভাজন তৈরি করেছে। তার মতে, এসব বিতর্কের কারণে রাষ্ট্রের মৌলিক সমস্যা ও মানুষের অধিকার-প্রাপ্তির বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর না করলে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে আনা সম্ভব নয়। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল বা দলীয়করণ করা হলে এগুলো তাদের কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারবে না। বিশেষ করে গুমের ঘটনায় তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের কাছে দেওয়া নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী আরও বলেন, বিএনপি তাদের প্রতিশ্রুতি ও জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, গুম কমিশন ও পুলিশ কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া উচিত নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএনপি এই ভুল পথ থেকে সরে এসে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুরোনো খাসলত বদলায় না কেন, এটি বোঝা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক কিছু ওয়াদা করে, কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে না। এর পেছনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকট রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকেই রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহিতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও কার্যকর করার পরিবর্তে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।তিনি বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মানবিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে অধিকার না দিলে তাকে মর্যাদা দেওয়া সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পুলিশ কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কারের প্রয়োজন থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। রাষ্ট্রের সংকট কাটাতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন, যার ভিত্তি হবে ক্ষমতার কাঠামো আলাদা করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের অমরত্বের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এই অমরত্বের ধারণাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পথ তৈরি করে। তাই শুধু নতুন রাজনৈতিক দল বা নতুন নেতৃত্ব এলেই হবে না; রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি। তা না হলে নতুনরাও পুরোনোদের মতো হয়ে যাবে। তিনি বলেন, “জাতিগত খাসলত যদি না বদলায়, তাহলে যা কিছু নতুন তাকে পুরাতন বলিয়াই মনে হবে।”বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল উদ্দেশ্য সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তা সরকারকে জবাবদিহি করতে পারবে না। গত ১৫-১৬ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।জুলাই সনদ ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ও সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “আপনারা ভোটের আগে বলে আসছেন, আপনারা ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করবেন, সুপ্রিম কোর্ট স্বাধীন করবেন, মানবাধিকার স্বাধীন করবেন। এটাও আছে নির্বাচন ইশতেহারে যে মানবাধিকার কমিশন স্বাধীন হবে এবং এটাকে একটা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড মেনে প্রতিষ্ঠা করা হবে। তো একটা কথাও তো আপনারা মানছেন না।”তিনি আরও বলেন, পুরোনো মানবাধিকার ও গুম আইন বাতিলের সময় নতুন ও আরও ভালো আইন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান খসড়া দেখে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আমাদের কথা আমাদের ১০০ বার, হাজার বার বলতে হবে।”

The Dhaka News Bangla

সম্পাদক: তাসকিন আহমেদ রিয়াদ 

কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত