গ্রামবাংলার বুক চিরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে থাকা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই চেনা গাছটি আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। দূর থেকে যার পাতা বাতাসে দুললে মনে হতো কোনো এক রূপকথার ডানা ঝাপটানো, সেই তালগাছ আজ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাংলার লোকসংস্কৃতি, প্রকৃতি আর রূপবৈচিত্র্যের সঙ্গে মিশে থাকা এই চিরচেনা গাছটি এখন আমাদের অবহেলা আর অসচেতনতার কারণে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। অথচ গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এই গাছের অবদান অনস্বীকার্য।
শৈশবের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে’ কবিতাটি পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। একসময় গ্রামীণ মেঠো পথ, পুকুর পাড় কিংবা ফসলের মাঠের আইল ধরে সারিবদ্ধ তালগাছের যে নয়নকাড়া দৃশ্য দেখা যেত, তা এখন শুধুই স্মৃতির পাতায় বন্দি। আধুনিকতার ছোঁয়া আর নগরায়ণের আগ্রাসনে নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে এই দীর্ঘজীবী গাছ। একটি তালগাছ পূর্ণাঙ্গ রূপ নিতে এবং ফল দিতে দীর্ঘ সময় নেয় বলে নতুন করে এই গাছ রোপণের প্রতি মানুষের আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন করে যেমন গাছ রোপণ করা হচ্ছে না, তেমনি পুরনো গাছগুলোও রক্ষা পাচ্ছে না কাঠের লোভী করাত থেকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তালগাছকে নিয়ে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা তৈরি হয়েছে যে, এটি বজ্রপাত প্রতিরোধ করে এবং একে প্রাকৃতিক ‘বজ্র নিরোধক’ বলা হয়ে থাকে। সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় লাখ লাখ তালগাছের বীজ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, তালগাছ বজ্রপাত ‘প্রতিরোধ’ করে, এই কথার কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আসলে গাছ কখনো বজ্রপাত ঠেকাতে বা রুখে দিতে পারে না। মূল বিষয় হলো, তালগাছ অত্যন্ত সুউচ্চ এবং এর কাণ্ড সোজা ওপরের দিকে উঠে যায়। আকাশে যখন মেঘের ঘর্ষণজনিত কারণে বিদ্যুতায়ন ঘটে, তখন বিদ্যুৎ সবসময় ভূমিতে নামার জন্য সবচেয়ে কাছের এবং উঁচু মাধ্যমটিকে বেছে নেয়। গ্রামীণ জনপদে অন্য গাছের তুলনায় তালগাছ বেশি উঁচু হওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি এর ওপর আছড়ে পড়ে। এতে করে চারপাশের ঘরবাড়ি বা নিচু এলাকায় থাকা মানুষ ও গবাদিপশু বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। অর্থাৎ, তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ করে না, বরং নিজের বুকে বজ্রপাতকে টেনে নিয়ে চারপাশের পরিবেশের জন্য একটি ঢাল বা বর্ম হিসেবে কাজ করে। দুঃখের বিষয় হলো, বিজ্ঞানসম্মত এই কার্যকারিতাটুকু পাওয়ার আগেই আমরা দেশজুড়ে উজার করে ফেলছি এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচকে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে প্রতি বছর বজ্রপাতে শত শত মানুষের অকাল মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।
তালগাছ শুধু মানুষের ঢাল হিসেবেই কাজ করে না, এটি ছিল এক অনন্য জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তালগাছের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খড়কুটো আর কাশবনের পাতা দিয়ে বোনা বাবুই পাখির সেই শৈল্পিক বাসা। তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলে থাকা বাবুই পাখির নিখুঁত কারুকার্যের বাসা দেখে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ বিরল। বাতাস এলে যখন তালগাছের পাতাগুলো দোল খেত, তখন সেই দোলনার মতো ঝুলন্ত বাসায় বাবুই পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠত চারপাশ। প্রকৃতি ও পাখির এই নান্দনিক মিতালী গ্রামীণ আবহকে এক স্বর্গীয় রূপ দিত। কিন্তু আজ তালগাছ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে শিল্পী পাখি বাবুই আর তার সেই বিখ্যাত ঝুলন্ত বাসা। এখন আর মেঠো পথের ধারে বাতাসে দোল খাওয়া তালপাতার সেই চিরচেনা শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যায় না, শোনা যায় না পাখির কলকাকলি।
প্রকৃতির পরম বন্ধু এই গাছটির অর্থনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। তাল পাতা দিয়ে তৈরি হাতপাখা, ঘরের ছাউনি, চাটাই এবং নানা রকমের কুটির শিল্প গ্রামীণ নারীদের আয়ের অন্যতম উৎস ছিল। তালের রস, সুস্বাদু তালের পিঠা কিংবা গরমে কচি তালের শাঁস বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ আমরা এই অমূল্য সম্পদটিকে হারিয়ে ফেলছি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বজ্রপাতের হাত থেকে গ্রামীণ জনপদের নিরাপত্তা এবং হারিয়ে যাওয়া বাবুই পাখিকে ফিরিয়ে আনতে আজ তালগাছ সুরক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে শুধু বীজ রোপণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, রোপণকৃত গাছের সঠিক পরিচর্যা ও পুরনো তালগাছ কাটা নিষিদ্ধ করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই বাংলার বুক থেকে এই ঐতিহ্যবাহী গাছটিকে চিরতরে হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না।

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে