দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষকে, যারা সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর রাতের কয়েক ঘণ্টা শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা কতটা বেড়েছে, তারই প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক লোডশেডিংয়ের রেকর্ডে। গতকাল রাত ১টায় সারা দেশে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের নতুন রেকর্ড। এর আগে রোববার বিকেল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিন-রাত মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে গ্রাহকদের। তবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের মানুষ। দিনের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকলেও কোনোভাবে সময় পার করা সম্ভব হলেও রাতের দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগ চরমে উঠছে।
সারাদিন মাঠে, কারখানায়, নির্মাণকাজে কিংবা রিকশা চালিয়ে পরিশ্রম করা শ্রমজীবী মানুষ রাতে একটু স্বস্তি ও বিশ্রামের প্রত্যাশা করেন। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সেই স্বাভাবিক বিশ্রামও ব্যাহত হচ্ছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় পরদিন কাজে ক্লান্তি, অবসাদ ও কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগও বাড়ছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে। গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার পর দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও গ্যাস সরবরাহ এখনো আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসেনি।
জ্বালানি সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ৫ হাজার মেগাওয়াট থেকে কমে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে নেমে এসেছে। পাশাপাশি ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও সরবরাহ প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমেছে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও উৎপাদন কমেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা এবং রাত ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত কম ছিল। ফলে বাধ্যতামূলকভাবে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়েছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বড় বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিড ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা দ্রুত সংকটের সমাধান। কারণ বিদ্যুৎ শুধু শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নয়; একজন শ্রমজীবী মানুষের সারাদিনের পরিশ্রমের পর কয়েক ঘণ্টা স্বস্তির ঘুম নিশ্চিত করাও এর সঙ্গে জড়িত।
গ্রামাঞ্চলে রাতের দীর্ঘ লোডশেডিং কমিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। উন্নয়নের সুফল শহর ও গ্রামের মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছানোই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে