ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন তিনটি বড় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী আন্দোলন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে কৃষকদের বিক্ষোভ এবং জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ও ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের দাবিতে কাশ্মীরি নেতাদের আন্দোলন এই তিন ইস্যুকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, একযোগে তিন দিকের চাপ সামলাতে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকার।
মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে যুব ও শিক্ষার্থীদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার (২০ জুলাই) সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে অন্তত ১৮০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে ১১৮ জনের বেশি পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী এবং অন্তত ৬০ জন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী রয়েছেন। সহিংসতার অভিযোগে প্রায় ৭০ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভোরেও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে দিল্লির যন্তর মন্তরে শত শত আন্দোলনকারী অবস্থান নেন। আগের দিনের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ এবং অস্থায়ী তাঁবু ভেঙে দেওয়ার পরও তারা রাতভর নতুন করে আশ্রয়স্থল তৈরি করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কারের ঘোষণা না আসা পর্যন্ত তারা অবস্থান কর্মসূচি থেকে সরে যাবেন না।
এদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকারকর্মীরা আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন। ভারতের হাইকোর্টও আন্দোলন মোকাবিলায় প্রশাসনকে আরও সংযত ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
অন্যদিকে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে 'দেশ বাঁচাও মোর্চা'র ব্যানারে আয়োজিত 'কিসান মহাপঞ্চায়েত' কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা হাজারের বেশি কৃষককে পাঞ্জাব-হরিয়ানার শম্ভু সীমান্তে আটকে দেয় পুলিশ।
হিন্দুস্তান টাইমস জানায়, মঙ্গলবার দিল্লির কিষাণ ঘাটে এই সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। তবে কৃষকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে শম্ভু সীমান্তে ঘাগ্গর নদীর সেতুর মুখে ব্যারিকেড বসিয়ে দেয় প্রশাসন।
কৃষক নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে দিল্লিতে পৌঁছাতে না দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সরকার এই অবরোধ সৃষ্টি করেছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে বিদেশি কৃষিপণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্য কম দামে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করবে। এতে দেশীয় কৃষক, খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।
তাদের দাবি, প্রস্তাবিত চুক্তির খসড়া প্রকাশ করতে হবে এবং কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করা যাবে না।
এদিকে, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পুনর্বহাল এবং সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও জোরালো হয়েছে।
শ্রীনগরের সংসদ সদস্য আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহেদি দিল্লির যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার যে সাংবিধানিক পরিবর্তন করেছিল, তা কাশ্মীরের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিচয় ক্ষুণ্ন করেছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে ৩৭০ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল এবং কাশ্মীরের পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।
একদিকে শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন, অন্যদিকে কৃষকদের বিক্ষোভ এবং একই সময়ে কাশ্মীর ইস্যুতে রাজনৈতিক কর্মসূচি সব মিলিয়ে রাজধানী দিল্লিতে অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি আন্দোলন যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে তা মোদি সরকারের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে