বর্তমান বিশ্বে অতিরিক্ত উৎপাদন, মাত্রাতিরিক্ত ভোক্তা সংস্কৃতি এবং যত্রতত্র বর্জ্য অপসারণ পরিবেশ ও প্রকৃতির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। এই বৈশ্বিক সংকট উত্তরণে প্রথাগত রৈখিক অর্থনীতি বা 'লিনিয়ার ইকোনমি' ধারণা থেকে সরে আসার তাগিদ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এর পরিবর্তে বিশ্বজুড়ে গুরুত্ব পাচ্ছে 'সার্কুলার ইকোনমি' বা বৃত্তাকার অর্থনীতি। এই বৃত্তাকার অর্থনীতির একটি শক্তিশালী ও কার্যকর অংশ হলো সেকেন্ডহ্যান্ড বা প্রি-ওন্ড বাজার। উন্নত বিশ্বের মতো উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, বই, আসবাবপত্র এবং যানবাহনের ক্ষেত্রে সেকেন্ডহ্যান্ড বা ব্যবহৃত পণ্যের বাজারের পরিধি ও সম্ভাবনা দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে।
প্রথাগত অর্থনীতি বনাম সেকেন্ডহ্যান্ড ধারা:
প্রচলিত রৈখিক নীতি অনুযায়ী সাধারণত প্রকৃতি থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে পণ্য উৎপাদন করা হয় এবং ব্যবহারের পর তা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন কাঁচামালের দ্রুত অপচয় ঘটছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। বিপরীতে, সেকেন্ডহ্যান্ড বাজারের প্রধান অর্থনৈতিক সুবিধা হলো সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য প্রাপ্তি। দেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বিশাল ভোক্তা শ্রেণি ব্যবহৃত বা সেকেন্ডহ্যান্ড পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে তাদের মৌলিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদা মেটাচ্ছে। একই সঙ্গে অব্যবহৃত পণ্য বিক্রি করে ব্যক্তি তার নিজস্ব সম্পদ থেকে আর্থিক মূল্য ফিরে পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনার খাতসমূহ:
বাংলাদেশে সেকেন্ডহ্যান্ড অর্থনীতির বিস্তার মূলত কয়েকটি প্রধান খাতে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রযুক্তি ও ডিভাইসে: রাজধানী ঢাকা বা বিভাগীয় শহরগুলোর কম্পিউটার মার্কেটগুলোতে ব্যবহৃত ল্যাপটপ, ডেস্কটপ ও স্মার্টফোনের একটি বিশাল ও সক্রিয় বাজার রয়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের শিক্ষার্থী, নতুন উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে প্রযুক্তি নিশ্চিতকরণে এটি বড় ভূমিকা রাখছে। বই ও প্রকাশনায়: বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বই থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার গাইড বা উপন্যাসের ক্ষেত্রে পুরনো বইয়ের বাজার (যেমন ঢাকার নীলক্ষেত বা অন্যান্য স্থানীয় বইয়ের বাজার) অত্যন্ত জনপ্রিয়। এটি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
যানবাহনে ও অন্যান্য:
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি বা ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের বাজার আমাদের পরিবহন ব্যবস্থায় একটি সাশ্রয়ী বিকল্প তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফেসবুক গ্রুপ ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর (যেমন বিক্রয় ডট কম) প্রসারের কারণে ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যবহৃত পণ্য কেনাবেচা এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। এর মাধ্যমে সংগ্রহ, মেরামত, পরিষ্কার, পরিবহন ও বিক্রয় প্রতিটি ধাপে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
সম্ভাবনা বনাম বাস্তব সীমাবদ্ধতা:
সেকেন্ডহ্যান্ড অর্থনীতির বহুমুখী সম্ভাবনা থাকলেও এর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, ব্যবহৃত পণ্যের গুণগত মান নিয়ে ক্রেতাদের মনে প্রায়ই অনিশ্চয়তা ও আস্থার অভাব থাকে। অনেক সময় প্রতারণা, ত্রুটিপূর্ণ পণ্য বিক্রি এবং পণ্যের প্রকৃত অবস্থা লুকিয়ে রাখার মতো ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয়ত, সেকেন্ডহ্যান্ড পণ্যের ব্যবহার পণ্যের জীবনকাল দীর্ঘায়িত করে এবং নতুন উৎপাদনের চাপ কমায়।
তবে পণ্যটি আদতে কত দিন টিকছে এবং তা নতুন পণ্য কেনার প্রকৃত বিকল্প হচ্ছে কি না তার ওপর এর পরিবেশবান্ধব হওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। ত্রুটিপূর্ণ পুরোনো ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী অনেক সময় বেশি বিদ্যুৎ ও কার্বন নির্গমন ঘটাতে পারে। তৃতীয়ত, অনলাইনভিত্তিক কেনাবেচায় বিক্রেতার সঠিক পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারণার ঝুঁকি থেকেই যায়।
উন্নয়ন ও উত্তরণের উপায়:
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেকেন্ডহ্যান্ড অর্থনীতির টেকসই বিকাশের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এক. গ্রেডিং ও মান যাচাই ব্যবস্থা: ব্যবহৃত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড বা গ্রেডিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে, যাতে ক্রেতা পণ্যের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেন। দুই. নিরাপদ লেনদেন ও ভোক্তা অধিকার: অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিক্রেতার পরিচয় যাচাই এবং কার্যকর ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তিন. মেরামত সংস্কৃতির প্রসার: ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মেরামত ও পুনঃনির্মাণ কাজের ওপর প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে উৎসাহিত করা উচিত। চার. সরকারি নীতি ও বৃত্তাকার অর্থনীতি: সরকারকে সেকেন্ডহ্যান্ড ও রি-কমার্স কার্যক্রমকে জাতীয় বৃত্তাকার অর্থনীতি কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পরিশেষে:
সেকেন্ডহ্যান্ড অর্থনীতি কেবল ভোক্তার ব্যয় কমায় না, বরং স্থানীয় অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং পরিবেশবান্ধব ভোগ নিশ্চিত করতে এই খাতের সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সঠিক নীতিমালার বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল এই সম্ভাবনাময় খাতটিকে বাংলাদেশের মূলধারার অর্থনীতির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।
ইশরাত জাহান ইশা
শিক্ষার্থী, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে