শনিবার, ০২ মে ২০২৬
The Dhaka News Bangla

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ
ছবি: সংগৃহীত

সেদিন সকালটা একটু অন্যরকম ছিল। বৃহস্পতিবার  ৩০ এপ্রিল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ স্টুডেন্ট ইন এগ্রিকালচারাল এন্ড রিলেটেড সাইন্সএস বাংলাদেশ আইইউবিএটি সংগঠনের শিক্ষার্থীরা  ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির কৃষি অনুষদের এর প্রায় ৫৫ জন  সদস্য সেদিন শ্রেণিকক্ষে যাননি। তাঁদের ক্লাস হবে বাইরে, কারখানার মেঝেতে, যেখানে তত্ত্ব আর বাস্তবতা মুখোমুখি হয়।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডায়মন্ড এগ লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড অ্যাগ্রো অ্যান্ড গ্রেইনস লিমিটেড। একটি সাধারণ লেয়ার খামার হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর পোল্ট্রি কমপ্লেক্সে — যেখানে স্বয়ংক্রিয় ডিম সংগ্রহ, আধুনিক হ্যাচারি এবং বৃহৎ ফিড মিল একই ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। জৈব নিরাপত্তার মান ও শিল্পমাত্রার পোল্ট্রি উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটি আজ বাংলাদেশে একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত।

যাক ঐদিন  সকাল সাড়ে আটটায় বাস ছাড়ল আইইউবিএটি ক্যাম্পাস থেকে। গন্তব্য গাজীপুরের কেন্দুয়াব, বীর উজলী, কাপাসিয়া — ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও ডায়মন্ড অ্যাগ্রো লিমিটেড। ড. মো. আব্দুস সবুর তালুকদার, সহকারী অধ্যাপক, কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস , আইইউবিএটি এবং  প্রধান সমন্বয়ক, ইয়াস বাংলাদেশ আইউবিএটি একাডেমিক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন। বাসের ভেতরে কথা, হাসি, প্রশ্নের ভিড় — কিন্তু সবার মনে একটাই কৌতূহল, ভেতরে গিয়ে আসলে কী দেখব?

যেখানে লাখো ডিম ছোঁয় না কোনো মানুষের হাত

প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতেই অ্যাকাউন্টস ও সেলস ম্যানেজার মনজুরুল মনজু এগিয়ে এলেন। মুখে হাসি, হাতে একগুচ্ছ তথ্য। তিনি প্রথমেই যা বললেন তাতে অনেকের চোখ কিছুটা বড় হয়ে গেল — এই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হয় ১০ লাখ ডিম। সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১৮ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত। শুধু সংখ্যাটাই না, এর পেছনের ব্যবস্থাটাও চমকের।

নয়টি উৎপাদন ঘর থেকে ডিম আসে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কনভেয়র বেল্টে চড়ে — একটিও ডিমে মানুষের হাত পড়ে না, সরাসরি পৌঁছে যায় সংরক্ষণাগারে। মনজুরুল মনজু হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলেন পুরো পথটা এবং বললেন,

“ফিডিং থেকে শুরু করে উৎপাদন ঘর থেকে স্টোরে পৌঁছানো পর্যন্ত সবটাই স্বয়ংক্রিয় — পুরোটাই মেশিনে হয়। কেবল ডিম গ্রেডিংয়ের কাজটুকু এখনো মানুষের হাতে।”

— মনজুরুল মনজু, ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস ও সেলস

উৎপাদন ঘরে থাকে লেয়ার পুলেট — ডিম দেওয়ার জন্য পালিত তরুণী মুরগি। সংরক্ষণাগারে ডিম রাখা হয় ছায়া ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায়, সরাসরি আলো বা গরম যেন না লাগে। ডিম গ্রেড হয় আকার, ওজন আর মুরগির বয়স অনুযায়ী। সাধারণ বাণিজ্যিক ডিমের মাপকাঠি ৬০ গ্রাম, তবে ৮০ থেকে ৯০ গ্রামের ডাবল কুসুমের ডিমও উৎপাদিত হয়, বাজারে যার চাহিদা আলাদা।

একটি ডিমও এখানে নষ্ট হয় না। ফাটা বা ভাঙা ডিম আলাদা করে মাছের খাবার হিসেবে বিক্রি করা হয়। এই একটা তথ্য দিয়েই বোঝা যায়, এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কতটা হিসেব করে নেওয়া।

পুরো এগ হাউসের দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ  জামিরুল ইসলাম, ম্যানেজার, ডায়মন্ড এগ লিমিটেড    এবং সিনিয়র সহকারি  মহাব্যবস্থাপক  সোহেল রানা বাবোরও পুরোটা সময় সঙ্গে থেকে শিক্ষার্থীদের একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন।

হ্যাচারি: তাপের এক ডিগ্রি হেরফেরও মানে বিপদ

হ্যাচারিতে ঢোকার আগে থামতে হলো। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, টিকা নিতে হবে, তারপর প্রবেশ। এটুকুতেই টের পাওয়া গেল, ভেতরটা কতটা সংবেদনশীল। মোহাম্মদ গোলাম কবির, উপমহাব্যবস্থাপক, ডায়মন্ড চিকস্ লিমিটেড প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে হাতে কলমে ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে শিখিয়েছেন।

প্রথম ধাপ রিসিভার সেকশন — বাইরে থেকে আসা ডিম এখানে ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। সেখান থেকে কোল্ড রুমে যায়, যেখানে তাপমাত্রা নামিয়ে আনা হয় ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রিতে। এই ধাপে ভ্রূণের বিকাশ ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করা হয়। কারণটা সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ — একটুখানি তাপমাত্রার হেরফেরেও ডিমের খোলে শিশির জমে, তৈরি হয় জীবাণু ঢোকার পথ।

ইনকিউবেশন হলে ছয়টি মেশিন একসঙ্গে চলছে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু চলাচল — সব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। প্রতিটি ট্রলিতে প্রায় চার হাজার পাঁচশো ডিম। এভাবে টানা আঠারো দিন। তারপর শুরু হয় ক্যান্ডেলিং — আলোর মধ্যে ধরে দেখা হয় প্রতিটি ডিমের ভেতরে ভ্রূণ বেঁচে আছে কি না। যে ডিমে জীবন আছে, কেবল সে-ই এগিয়ে যায়।

হ্যাচিংয়ের আগে প্যারাফর্মালডিহাইড দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ফোটার পরপরই ছানাগুলোকে আলাদা করা হয় — রং দেখে এবং ক্লোয়াকা সেক্সিং পদ্ধতিতে। মেয়ে ছানা যাবে লেয়ার ট্র্যাকে, বড় হয়ে ডিম দেবে। ছেলে ছানা যাবে মাংসের পথে, প্রায় পঁয়তাল্লিশ দিনে বাজারে আসবে। ছানার ঘরে তাপমাত্রা রাখা হয় ছাব্বিশ থেকে আটাশ ডিগ্রি এবং এ পর্যায়েই দেওয়া হয় নিউক্যাসল ডিজিজ ও ইনফেকশাস বার্সাল ডিজিজের টিকা, যা ছানার প্রাথমিক মৃত্যুহার অনেকটা কমিয়ে আনে।

ফিড ইউনিট: ভুট্টা থেকে শুরু হয় জীবনের রসদ

দুপুরে খাওয়ার পর দলটি গেলেন ডায়মন্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের ফিড উৎপাদন বিভাগে।

ফিডের মূল কাঁচামাল ভুট্টা — এটাই পুরো ফর্মুলেশনের ভিত্তি। বাকি উপকরণ বেশিরভাগ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, তবে কিছু মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট আসে বিদেশ থেকে। এই কৌশলটি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

কাঁচামাল পৌঁছানোর পর নামে ভূগর্ভস্থ চেইন কনভেয়রে। চারটি চেম্বারে পরিষ্কার হওয়ার পর একটি তিন-গেট বাছাই ব্যবস্থায় উপকরণ যায় তিন দিকে — সরাসরি স্টোরেজে, অতিরিক্ত ক্লিনারে, অথবা লাল রঙের ড্রায়ার ইউনিটে। পরিষ্কৃত সব কাঁচামাল জমা হয় হপারে। প্রতিটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার কিলোগ্রাম উপকরণ ব্যবহার হয় এবং পুরো সিস্টেমকে সচল হতে সময় লাগে ছয় মাস। উপকরণের চলাচল পুরোটাই ব্লোয়ার সিস্টেমে — কোথাও মানুষের হাত লাগে না।

মিশ্রণ চেম্বারে ভুট্টার সঙ্গে মেশানো হয় ভিটামিন, খনিজ লবণ, সাধারণ লবণ আর ক্যালসিয়ামের জন্য চুনাপাথর। তারপর ক্রাশার, মিক্সার আর প্রসেসিং ইউনিট পেরিয়ে ফিড যায় হিটার চেম্বারে — চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপে ধ্বংস হয় যাবতীয় জীবাণু। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়, নির্ধারিত অনুপাত মেনে প্রতিটি ব্যাচ তৈরি হয়। এই কারখানায় প্রতিদিন লাগে একশো বিশ থেকে একশো পঞ্চাশ টন ফিড।মোঃ আবু সাঈদ, সরকারি মহাব্যবস্থাপক, ডায়মন্ড ফিডস এন্ড গ্রেইন্স লিঃ প্রত্যেকটা ধাপ খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেন।

ফেরার পথে যে উপলব্ধি

বিকেলে বাসে ফেরার সময় অনেকে চুপচাপ ছিলেন। সেই চুপ থাকাটাও একধরনের ভাবনা। সারাদিনে যা দেখলেন তা কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয় — এটা জীবন্ত, চলমান, প্রতিদিন লাখো মানুষের পাতে পৌঁছে যাওয়া একটা উৎপাদনব্যবস্থা। জৈব নিরাপত্তার খুঁটিনাটি, ইনকিউবেশনের বিজ্ঞান, ভুট্টাভিত্তিক পুষ্টি পরিকল্পনা থেকে স্বয়ংক্রিয় পেলেট তৈরি — প্রতিটি ধাপে একটাই বার্তা স্পষ্ট হয়েছে: বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প এখন আর শুধু পরিচিত মুরগির খামার নয়, এটি কৃষিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব।

ড. শাবুর তালুকদারের একাডেমিক তত্ত্বাবধানে এই পরিদর্শন সফলভাবে শেষ হয়। দলের পক্ষ থেকে ডায়মন্ড এগ লিমিটেড,  সকল অংশগ্রহণকারীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

শুভ্র/

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে

The Dhaka News Bangla

শনিবার, ০২ মে ২০২৬


ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে পোল্ট্রিবিজ্ঞানের জীবন্ত পাঠ

প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬

featured Image
সেদিন সকালটা একটু অন্যরকম ছিল। বৃহস্পতিবার  ৩০ এপ্রিল, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ স্টুডেন্ট ইন এগ্রিকালচারাল এন্ড রিলেটেড সাইন্সএস বাংলাদেশ আইইউবিএটি সংগঠনের শিক্ষার্থীরা  ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির কৃষি অনুষদের এর প্রায় ৫৫ জন  সদস্য সেদিন শ্রেণিকক্ষে যাননি। তাঁদের ক্লাস হবে বাইরে, কারখানার মেঝেতে, যেখানে তত্ত্ব আর বাস্তবতা মুখোমুখি হয়।গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছে ডায়মন্ড এগ লিমিটেড এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডায়মন্ড অ্যাগ্রো অ্যান্ড গ্রেইনস লিমিটেড। একটি সাধারণ লেয়ার খামার হিসেবে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে এটি রূপ নিয়েছে দেশের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর পোল্ট্রি কমপ্লেক্সে — যেখানে স্বয়ংক্রিয় ডিম সংগ্রহ, আধুনিক হ্যাচারি এবং বৃহৎ ফিড মিল একই ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। জৈব নিরাপত্তার মান ও শিল্পমাত্রার পোল্ট্রি উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটি আজ বাংলাদেশে একটি রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত।যাক ঐদিন  সকাল সাড়ে আটটায় বাস ছাড়ল আইইউবিএটি ক্যাম্পাস থেকে। গন্তব্য গাজীপুরের কেন্দুয়াব, বীর উজলী, কাপাসিয়া — ডায়মন্ড এগ লিমিটেড ও ডায়মন্ড অ্যাগ্রো লিমিটেড। ড. মো. আব্দুস সবুর তালুকদার, সহকারী অধ্যাপক, কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস , আইইউবিএটি এবং  প্রধান সমন্বয়ক, ইয়াস বাংলাদেশ আইউবিএটি একাডেমিক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দলের সঙ্গে ছিলেন। বাসের ভেতরে কথা, হাসি, প্রশ্নের ভিড় — কিন্তু সবার মনে একটাই কৌতূহল, ভেতরে গিয়ে আসলে কী দেখব?যেখানে লাখো ডিম ছোঁয় না কোনো মানুষের হাতপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতেই অ্যাকাউন্টস ও সেলস ম্যানেজার মনজুরুল মনজু এগিয়ে এলেন। মুখে হাসি, হাতে একগুচ্ছ তথ্য। তিনি প্রথমেই যা বললেন তাতে অনেকের চোখ কিছুটা বড় হয়ে গেল — এই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন সংগ্রহ করা হয় ১০ লাখ ডিম। সর্বোচ্চ সক্ষমতা ১৮ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত। শুধু সংখ্যাটাই না, এর পেছনের ব্যবস্থাটাও চমকের।নয়টি উৎপাদন ঘর থেকে ডিম আসে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় কনভেয়র বেল্টে চড়ে — একটিও ডিমে মানুষের হাত পড়ে না, সরাসরি পৌঁছে যায় সংরক্ষণাগারে। মনজুরুল মনজু হাত দিয়ে দেখিয়ে দিলেন পুরো পথটা এবং বললেন,“ফিডিং থেকে শুরু করে উৎপাদন ঘর থেকে স্টোরে পৌঁছানো পর্যন্ত সবটাই স্বয়ংক্রিয় — পুরোটাই মেশিনে হয়। কেবল ডিম গ্রেডিংয়ের কাজটুকু এখনো মানুষের হাতে।”— মনজুরুল মনজু, ম্যানেজার, অ্যাকাউন্টস ও সেলসউৎপাদন ঘরে থাকে লেয়ার পুলেট — ডিম দেওয়ার জন্য পালিত তরুণী মুরগি। সংরক্ষণাগারে ডিম রাখা হয় ছায়া ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায়, সরাসরি আলো বা গরম যেন না লাগে। ডিম গ্রেড হয় আকার, ওজন আর মুরগির বয়স অনুযায়ী। সাধারণ বাণিজ্যিক ডিমের মাপকাঠি ৬০ গ্রাম, তবে ৮০ থেকে ৯০ গ্রামের ডাবল কুসুমের ডিমও উৎপাদিত হয়, বাজারে যার চাহিদা আলাদা।একটি ডিমও এখানে নষ্ট হয় না। ফাটা বা ভাঙা ডিম আলাদা করে মাছের খাবার হিসেবে বিক্রি করা হয়। এই একটা তথ্য দিয়েই বোঝা যায়, এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত কতটা হিসেব করে নেওয়া।পুরো এগ হাউসের দায়িত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ  জামিরুল ইসলাম, ম্যানেজার, ডায়মন্ড এগ লিমিটেড    এবং সিনিয়র সহকারি  মহাব্যবস্থাপক  সোহেল রানা বাবোরও পুরোটা সময় সঙ্গে থেকে শিক্ষার্থীদের একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন।হ্যাচারি: তাপের এক ডিগ্রি হেরফেরও মানে বিপদহ্যাচারিতে ঢোকার আগে থামতে হলো। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, টিকা নিতে হবে, তারপর প্রবেশ। এটুকুতেই টের পাওয়া গেল, ভেতরটা কতটা সংবেদনশীল। মোহাম্মদ গোলাম কবির, উপমহাব্যবস্থাপক, ডায়মন্ড চিকস্ লিমিটেড প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীকে হাতে কলমে ও বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিয়ে শিখিয়েছেন।প্রথম ধাপ রিসিভার সেকশন — বাইরে থেকে আসা ডিম এখানে ২০ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। সেখান থেকে কোল্ড রুমে যায়, যেখানে তাপমাত্রা নামিয়ে আনা হয় ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রিতে। এই ধাপে ভ্রূণের বিকাশ ইচ্ছাকৃতভাবে ধীর করা হয়। কারণটা সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ — একটুখানি তাপমাত্রার হেরফেরেও ডিমের খোলে শিশির জমে, তৈরি হয় জীবাণু ঢোকার পথ।ইনকিউবেশন হলে ছয়টি মেশিন একসঙ্গে চলছে। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ু চলাচল — সব নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। প্রতিটি ট্রলিতে প্রায় চার হাজার পাঁচশো ডিম। এভাবে টানা আঠারো দিন। তারপর শুরু হয় ক্যান্ডেলিং — আলোর মধ্যে ধরে দেখা হয় প্রতিটি ডিমের ভেতরে ভ্রূণ বেঁচে আছে কি না। যে ডিমে জীবন আছে, কেবল সে-ই এগিয়ে যায়।হ্যাচিংয়ের আগে প্যারাফর্মালডিহাইড দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হয়। ফোটার পরপরই ছানাগুলোকে আলাদা করা হয় — রং দেখে এবং ক্লোয়াকা সেক্সিং পদ্ধতিতে। মেয়ে ছানা যাবে লেয়ার ট্র্যাকে, বড় হয়ে ডিম দেবে। ছেলে ছানা যাবে মাংসের পথে, প্রায় পঁয়তাল্লিশ দিনে বাজারে আসবে। ছানার ঘরে তাপমাত্রা রাখা হয় ছাব্বিশ থেকে আটাশ ডিগ্রি এবং এ পর্যায়েই দেওয়া হয় নিউক্যাসল ডিজিজ ও ইনফেকশাস বার্সাল ডিজিজের টিকা, যা ছানার প্রাথমিক মৃত্যুহার অনেকটা কমিয়ে আনে।ফিড ইউনিট: ভুট্টা থেকে শুরু হয় জীবনের রসদদুপুরে খাওয়ার পর দলটি গেলেন ডায়মন্ড অ্যাগ্রো লিমিটেডের ফিড উৎপাদন বিভাগে।ফিডের মূল কাঁচামাল ভুট্টা — এটাই পুরো ফর্মুলেশনের ভিত্তি। বাকি উপকরণ বেশিরভাগ স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়, তবে কিছু মাইক্রো-নিউট্রিয়েন্ট আসে বিদেশ থেকে। এই কৌশলটি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখে।কাঁচামাল পৌঁছানোর পর নামে ভূগর্ভস্থ চেইন কনভেয়রে। চারটি চেম্বারে পরিষ্কার হওয়ার পর একটি তিন-গেট বাছাই ব্যবস্থায় উপকরণ যায় তিন দিকে — সরাসরি স্টোরেজে, অতিরিক্ত ক্লিনারে, অথবা লাল রঙের ড্রায়ার ইউনিটে। পরিষ্কৃত সব কাঁচামাল জমা হয় হপারে। প্রতিটি ব্যাচে প্রায় এক হাজার কিলোগ্রাম উপকরণ ব্যবহার হয় এবং পুরো সিস্টেমকে সচল হতে সময় লাগে ছয় মাস। উপকরণের চলাচল পুরোটাই ব্লোয়ার সিস্টেমে — কোথাও মানুষের হাত লাগে না।মিশ্রণ চেম্বারে ভুট্টার সঙ্গে মেশানো হয় ভিটামিন, খনিজ লবণ, সাধারণ লবণ আর ক্যালসিয়ামের জন্য চুনাপাথর। তারপর ক্রাশার, মিক্সার আর প্রসেসিং ইউনিট পেরিয়ে ফিড যায় হিটার চেম্বারে — চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ ডিগ্রি তাপে ধ্বংস হয় যাবতীয় জীবাণু। পুরো প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়, নির্ধারিত অনুপাত মেনে প্রতিটি ব্যাচ তৈরি হয়। এই কারখানায় প্রতিদিন লাগে একশো বিশ থেকে একশো পঞ্চাশ টন ফিড।মোঃ আবু সাঈদ, সরকারি মহাব্যবস্থাপক, ডায়মন্ড ফিডস এন্ড গ্রেইন্স লিঃ প্রত্যেকটা ধাপ খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেন।ফেরার পথে যে উপলব্ধিবিকেলে বাসে ফেরার সময় অনেকে চুপচাপ ছিলেন। সেই চুপ থাকাটাও একধরনের ভাবনা। সারাদিনে যা দেখলেন তা কোনো পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় নয় — এটা জীবন্ত, চলমান, প্রতিদিন লাখো মানুষের পাতে পৌঁছে যাওয়া একটা উৎপাদনব্যবস্থা। জৈব নিরাপত্তার খুঁটিনাটি, ইনকিউবেশনের বিজ্ঞান, ভুট্টাভিত্তিক পুষ্টি পরিকল্পনা থেকে স্বয়ংক্রিয় পেলেট তৈরি — প্রতিটি ধাপে একটাই বার্তা স্পষ্ট হয়েছে: বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প এখন আর শুধু পরিচিত মুরগির খামার নয়, এটি কৃষিবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব।ড. শাবুর তালুকদারের একাডেমিক তত্ত্বাবধানে এই পরিদর্শন সফলভাবে শেষ হয়। দলের পক্ষ থেকে ডায়মন্ড এগ লিমিটেড,  সকল অংশগ্রহণকারীর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।শুভ্র/

The Dhaka News Bangla

সম্পাদক: তাসকিন আহমেদ রিয়াদ 

কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত