২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২৪ সালের জুলাই আগষ্ট মাসটা যেমন বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর গনহত্যার একটা মাস তেমনি ফ্যাসিবাদ দূর করার স্বাধীন সর্বভৌর্মতের,গনতন্ত্রের অধিকার আদায়ের এক অধ্যায়, সারা দেশে যখন বৈষম্য, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশের লাখো মানুষ আন্দোলন করছিল সে সময় আগষ্টের ৪ তারিখ চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার ছাত্র-যুবক, রাজপথে নেমে এসেছিলেন। স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে তাদের সাহসী অবস্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে।
হাইমচরেও আন্দোলনের সূচনা হয় ধীরে ধীরে শিক্ষার্থী, তরুণ সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের উদ্যোগে সোস্যাল মিডিয়াতে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন করার পরিকল্পনা প্রস্তুুস্তি নিতে থাকে। তবে বিষয়টা তত সহজ ছিল না। বার বাঁধা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল।
শুরুটা ১৩ জুলাই থেকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বন্ধুদের সাথে আন্দোলন করার ব্যাপারে অনলাইন কথা বলতে থাকি তাদের চিন্তা ভাবনা জানতে চাই।
তার আগে থেকেই আড্ডার মধ্যে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করি কী হবে কি করনীয় এসব বিষয়ে প্রতিদিন আলোচনা চলতে থাকে।তার মধ্যে ছিল আমাদের HSC পরীক্ষা।
পাশাপাশি কয়েকটি মেসেঞ্জার গ্রুপে এ বিষয়ে কথা হয়। তবে গ্রুপ গুলোর আলোচনায় ছাত্রলীগের বাহিনী থাকায় তারা বিভিন্ন ভাবে তথ্য প্রাচার করতে শুরু করে।এর জন্য বেশ কয়েকটি গ্রুপ রিমুভ করা হয়েছে।
-১৬ তারিখ রাতে বাজারের এক ছাদে কিছু বড় ভাইয়ের সাথে আমার কিছু বন্ধু সহ আলোচনা করি কবে আন্দোলন করা যায়। তখন দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল,প্রতিদিনই মানুষ মারা যেতো তখন আমরা সিন্ধান্ত নেই ১৭ তারিখ দুপুর ২:৩০ মিনিটে আন্দোলন হবে এবং সেটি বয়েজ স্কুল থেকে শুরু হবে।
সেখানে উপজেলার সকল ছাত্র- ছাত্রী জড়ো হবে সেখান থেকে মিছিল শুরু হবে। পাশাপাশি একটি মেসেঞ্জার গ্রুপ ও খোলা হয়। আন্দোলন করার জন্য প্রয়োজন ছিল ব্যানার তার জন্য ওই রাতে প্রায় ১১ টার দিকে আমার ৩ বন্ধু(রাব্বি,ইফাত,টিপু) মিলে মোটরসাইকেল দিয়ে চাঁদপুর উদেশ্য রওনা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সময় এবং স্থান গ্রুপে জানানোর পর সবাই সবার মতো মানুষ যোগান দিচ্ছিল।(অনেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলেছে পরে শুনেছি) আবার কেউ কেউ সেটি তাদের অনন্য গ্রুপ এবং ফেসবুক পোস্ট করে। কিছুক্ষণ পর সেটি জানাজানি হলে প্রসাশন ও লীগের চাপের মুখে ওই রাতে সেটি হবে না বলে সিধান্ত পরিবর্তন করা হয়। ব্যানার তৈরি করার জন্য ওরা হরিনা পর্যন্ত চলে গেছে তাদেরকে ফোন করে ফেরত আনা হয়।
তবে ছাত্র-ছাত্রীদের মনোবল শক্ত রাখার জন্য গ্রুপে বলা হয় চাঁদপুর জেলায় বড় আন্দোলন হবে বিধায় উপজেলায় কোন আন্দোলন হচ্ছে না! সকলকে জেলা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য বলা হয়
এবং সাথে সাথে সেই গ্রুপটি রিমুভ করা হয়।
তবে লক্ষ্য ছিল হাইমচর উপজেলার আলগী-বাজারে যে কোন মূলে আন্দোলন করতেই হবে।
কয়েকদিন চাঁদপুরে আন্দোলন পাশাপাশি হাইমচরে কিভাবে আন্দোলন করা যায় সে নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করে।
আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছিল সাহস, ত্যাগ ও সংগ্রামের প্রতীক। নানা বাধা-বিপত্তি, ভয়-ভীতি ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করেও আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিতে অটল ছিলেন। তাদের এই দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। সকলে মধ্যে ছিল আলাদা এক বন্ধন (আন্দোলনে একক কারো নেতৃত্ব ছিল না সবাই সবার জায়গা থেকে নিজ উদ্যাগে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করছে)
সর্বশেষ অবস্থা যখন একেভাবে ভয়াবহ আগষ্টের ২ তারিখ রাতে গ্রপে বলা হয় আমরা সরাসরি বসে আন্দোলন করার সিধান্ত নিব। যেহেতু, গ্রুপে অনেক ভুল তথ্য এবং আমাদের সিদ্ধান্ত আগে থেকে লিকেজ হয়ে যাচ্ছে।
পরের দিন ৩ আগষ্ট সকালে হাইমচর সরকারি কলেজের সামনে আন্দোলন বিষয়ে চূড়ান্ত সিধান্ত নেওয়া হয়। সে দিন অনেক কে আসতে বলা হলেও অল্প কয়েকজন এসেছে। তাদের নিয়েই সিধান্ত নেওয়া হয় তাদের নাম গুলো না বললে হয়তো সেদিনের ইতিহাস অসম্পূর্ন থেকে যাবে, ফয়েজ ভাই,বেলাল ভাই,রাব্বানী,টিপু,ইফাত,কলেজ এলাকার বেশ কয়েকজন।
সিধান্ত বলা হয় ৪ আগষ্ট বিকাল ৩ টায় হাইমচর সরকারি কলেজ মাঠ থেকে মিছিল নিয়ে আলগী-বাজার যাবে। তার আগেই সকল কে উপস্থিত থাকতে হবে। এবং আরো অনন্য বিষয়ে আলোচনা করা হয়। আমারা কথা বলে আসার কিছুক্ষন পরে জানতে পারি পুলিশ সেখানে হানা দেয়। এবং সেখানে কয়েকজনকে বসতে থাকে দেখে তাদেরকে দৌড়ানি দেওয়া হয়। সে সিধান্ত গ্রুপে জানানো হয় এবং সেদিন থেকে প্রত্যেকের জায়গা থেকে আন্দোলন দাওয়াত দিতে থাকে এবং সর্বচ্ছো জনবল আনার জন্য বলা হয়। এবং সেটি সোস্যাল মিডিয়াতে ও প্রচার করা হয়। পরের দিন ৪ আগষ্ট আন্দোলনের তারিখ,সকালে আবারো স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়।
তবে ওই দিনে যেটা আমাদের জানা ছিল না একেবারে হুট করে সকাল ১০ টার দিকে নীলকমল ওসমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রীরা, চলমান হত্যার প্রতিবাদে মিছিল নিয়ে আলগী বাজারে আসে। তার আগে সকাল থেকেই আলগী-বাজারে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ,যুবলীগের বাহিনী অবস্থান নেয়। তখন ওই ছাত্রীরা বাজারে আসলে তারা বাধা দিয়ে কৌশলের তাদেরকে বিদ্যালয়ে ফেরত পাঠায়।
তবে মূল আন্দোলন ছিল বিকাল ৩ টায়। পূর্বের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকলেই অনেকেই কলেজ মাঠে উপস্থিত হয়েছে তবে অনেকেই এখনো ভয়ে আসতে চাচ্ছে না এবং আন্দোলন হবে কিনা সেই বিষয়ে অনিশ্চিত ছিল তার জন্য অনেককে বার বার ফোন দিয়ে আনা হয়। এবং আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় পোস্টার অনেকেই সাথে নিয়ে এসেছেন। আমিও বেশ কয়েকটি ছোট বড় পোস্টার বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। মিছিলে মেয়েদের উপস্থিতি বেশ ভালো ছিল। পূর্বে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিকাল তিনটায় মিছিল নিয়ে আলী বাজার যাওয়ার জন্য রওনা হয়।
ওই মিছিলে সম্ভবত হাইমচর উপজেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছে। প্রায় ১৫০০ অধিক শিক্ষার্থী মিছিলে অংশগ্রহণ করে। মিছিল নিয়ে থানা ও উপজেলা রোড দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে দিয়ে বিসমিল্লাহর মোড়ে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা।
থানা উপজেলা রোড দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ যাতে উপজেলা কিংবা থানার মধ্যে কোন ধরনের হামলা না চালায় তার জন্য অনেক শিক্ষার্থী আগে থেকেই ব্যারিকেট বানিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
বিসমিল্লাহর মোড়ে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন স্লোগান দিতে থাকে তাদের সামনে ছিল অবস্থানরত পুলিশের বাধা পিছনে ছিল আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ বাহিনীর অবস্থান। কয়েক মিনিটের মাথায় ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের গুন্ডাবাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। এর মধ্যেই পুলিশ টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। হামলা এবং টিয়ার্সেলের ধোয়ায় শিক্ষার্থীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে,লীগের বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দাওয়া দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর কিছু শিক্ষার্থী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে।
“তবে অস্ত্র ধারী ছাত্রলীগের মুখে তারা ছিল একেবারেই নিরুপায়”।
এতে পায় একাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।এর মধ্যে অনেকই গুরুতর আহত হয়। অনেকে হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নিয়ে গেলে তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং সেখানেও নাকি ছাত্রলীগ চিকিৎসা দিতেও বাধা প্রদান করে।
অনেক আহত শিক্ষার্থী বিভিন্ন ময়লা যোপজাড় দিয়ে আশেপাশের অনেক বাড়িতে অবস্থান নেয়।
হামলা পাল্টা হামলায় পরিস্থিতি থমথমে ছিল।
ঐদিন সাধারণ নিরস্র শিক্ষার্থীদের ওপর লীগের হামলা ছিল একেবারে নিন্দানীয়।
হাইমচর উপজেলার মতো ছোট্ট একটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের এ নিশংসতা মনে রাখবে হাইমচর বাসী।সাধারণ মানুষ এখনো বলে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ ঐদিন কি সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর আমাদের বাচ্চাদের উপর হামলা না করলে পারতো না? এমন কি কারন ছিল যে তাদের উপর হামলা করতে হয়েছিল?
পরের দিন সেই ঐতিহাসিক ৫ই আগষ্ট। সকাল থেকেই শিক্ষার্থীরা আবারো আন্দোলন নামার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তবে বেলা বাড়ার সাথে সাথে আবার আভাস মিলছিল যে সরকারের পতন হতে যাচ্ছে। এটি দুপুরের পরপর পুরোপুরিভাবেই নিশ্চিত হয়। তখন থেকেই চারদিকে থাকা শিক্ষার্থী এবং মানুষজন মিছিল নিয়ে উল্লাস করতে করতে আলগী-বাজারে আসে। সেই দিনটি যেন ভুলার মত নয় মানুষের মধ্যে যেন ঈদ লিখে গেছে ঐদিন বাজারে যে কয়টি মিষ্টির দোকান খোলা ছিল সবগুলো যেন ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। মানুষের উল্লাস স্লোগান পুরো আকাশ-বাতাল যেন উত্তাল হয়ে পড়ে। পুরো বাজার ছিল লোকে লোকারন্য আগের দিন শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারী লীগ বাহিনী পালিয়েছে।
বছরের পর বছরে যাবে যখন জুলাই- আগষ্ট আসবে তখন ইতিহাসের ৩৬ দিনের বীরত্ব কথা মনে পড়বে,হাইমচর মানুষ হয়তো সহজে ৪ আগষ্ট ২০২৪ কথা ভুলবে না।

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ আগস্ট ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে