বাংলাদেশ রাজনীতির ইতিহাসের এক উত্তাল ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের নাম চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থান একদিনে আসেনি; এর পেছনে রয়েছে সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে অসংখ্য তরুণের রক্ত, ঘাম এবং সীমাহীন আত্মত্যাগ। তেমনই একজন লড়াকু সৈনিকের নাম রফিক মিজি। চাঁদপুর জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি এক সুপরিচিত ও সাহসী নাম। জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এই আপসহীন নেতার জন্ম চাঁদপুর শহরের প্রফেসর পাড়ায়। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজপথের লড়াকু সৈনিক, দায়িত্ব পালন করেছেন চাঁদপুর সরকারি কলেজ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সদস্য সচিব হিসেবে। বর্তমানে তিনি জেলা যুবদলের অন্যতম সক্রিয় নেতা।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে রফিক মিজিকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। একের পর এক রাজনৈতিক মামলা, দফায় দফায় জেল-জুলুম এবং অবর্ণনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল যখন তাকে শেখ হাসিনার কুখ্যাত 'আয়নাঘরে' বন্দি রাখা হয়।
সেদিনগুলোর কথা মনে করে আজও শিউরে ওঠেন চাঁদপুরবাসী। হাসিনার গুম বাহিনীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল রফিক মিজিকে 'ক্রসফায়ারে' চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। মৃত্যুর খুব কাছ থেকে অলৌকিক ও ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছিলেন তিনি। কিন্তু এরপরও দমাতে পারেনি তৎকালীন প্রশাসন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২৮ মার্চ সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির বাসভবনের সামনের সড়কে বোমা হামলার একটি রাজনৈতিক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
জুলাই বিপ্লব ও সেই ঐতিহাসিক ১৮ জুলাই
চব্বিশের কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন চাঁদপুরের রাজপথেও নেমে আসেন রফিক মিজি। বিগত বছরগুলোর নির্যাতন তাকে দমাতে পারেনি, বরং আরও সাহসী করে তুলেছে।
ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সন্ধ্যার। চাঁদপুরে তখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে ছাত্রলীগের তুমুল ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছে। ঠিক সাড়ে ৭টায় চাঁদপুর সরকারি কলেজ গেটের সামনে থেকে রফিক মিজিকে টার্গেট করে ছাত্রলীগ ও পুলিশ। একপর্যায়ে বিপনিবাগ বাজার এলাকা থেকে ছাত্রলীগ কর্মীরা তাকে অবরুদ্ধ করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। সে সময় দায়িত্বে ছিলেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুদীপ্ত। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। রিমান্ডের নামে তার ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন।
পরবর্তীতে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার দেশ ছেঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর, এক নতুন ভোরের সূচনা হয়। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ কারাগার থেকে নির্বাহী আদেশে ৬ আগস্ট আদালত থেকে মুক্তি পান এই বীর যোদ্ধা। কারাফটকে তখন তাকে বরণ করতে অপেক্ষমাণ ছিল হাজারো জনতা।
নেতার নির্দেশনা ও অনুভূতির কথা
কারামুক্তির পর নিজের অনুভূতি এবং সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন রফিক মিজি। তিনি বলেন:
"দেশনায়ক তারেক রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে এবং চাঁদপুর জেলা বিএনপির কান্ডারি, আমাদের অভিভাবক শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ভাইয়ের নির্দেশনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিদায় করতে নিজের জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমেছিলাম। রংপুরের আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামের ছাত্রদল নেতা ওয়াসিমকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তা দেখার পর একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। ১৮ জুলাই চাঁদপুরে যুবদল নেতা হিসেবে আমিই প্রথম গ্রেপ্তার হই।"
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে আরও যোগ করেন, "যদি ৫ আগস্টের সেই ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল না হতো, তবে হয়তো আমি আর কোনোদিন কারাগার থেকে বেঁচে ফিরতে পারতাম না। তারা আমাকে শেষ করে দিত। তবে এই কঠিন সময়ে আমাদের জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক ভাইয়ের সাহস ও অবদান আমি কোনোদিন ভুলব না। কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় প্রতিটি ক্ষণ তিনি আমার ও আমার পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন, আমাদের সাহস জুগিয়েছেন।"
রফিক মিজির এই গল্প কেবল একজন ব্যক্তির লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াইয়ে বাংলাদেশের হাজারো যুবকের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার গল্প। আয়নাঘরের অন্ধকার আর ক্রসফায়ারের হুমকি পেরিয়ে রফিক মিজি আজ এক মুক্ত বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক, যিনি তার নেতার আদর্শে ও জনগণের অধিকারে আজও সমানভাবে অবিচল।
বিষয় : জুলাইযোদ্ধা

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুলাই ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে