বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
The Dhaka News Bangla

মতলবে এতিমদের ৪৬ টন চালের অর্ধেকের বেশি গায়েব!

মতলবে এতিমদের ৪৬ টন চালের অর্ধেকের বেশি গায়েব!
সাড়ে পাঁচানি হোসাইনিয়া মাদ্রাসা | ছবি: সংগৃহীত

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪৬ এতিমখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় মোট ৪৬ টন চাল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি চাল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছে বলে দাবি করেছে। কোথাও কোথাও চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি নীতিমালারও পরিপন্থী।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানা পরিদর্শনে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম চাল পেয়েছেন।

কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এক টন চালের বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকারও বেশি হলেও তাদের হাতে চাল না দিয়ে মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানা-এর কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, চালের পরিবর্তে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদ্রাসা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসা, মুদাফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদ্রাসা ও পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, তারা এক টনের বদলে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছেন।

অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় শুধুমাত্র ডিজিটাল সাইনবোর্ড টানিয়ে এতিমখানার অস্তিত্ব দেখানো হলেও সেখানে এতিম শিশুদের বসবাস বা শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো বাস্তব চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও সরকারি এক টন চালের বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকায় রয়েছে। বিষয়টি বরাদ্দ প্রক্রিয়া ও উপকারভোগী যাচাই নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

এতিমদের জন্য বরাদ্দ চাল আত্মসাতের অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তারা বিশ্বাস করেন না। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনো প্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে এমন অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।

তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিস, প্রকৌশল অফিসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তারা এসব বিষয়ে দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা মাত্র ৬০০ কেজি চাল পেয়েছি। এতিমদের প্রাপ্য চাল আত্মসাৎ অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি বশির আহমেদ খান বলেন, এতিমদের চাল আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি ইউএনওর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে কখনো আমি নিজে, আবার কখনো অফিসের স্টাফদের মাধ্যমে এতিমখানার প্রতিনিধিদের চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাল কম পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও ইস্যু করা হয়েছে। সব কাগজপত্র আমাদের কাছে রয়েছে। বরাদ্দ দেওয়ার পর বাইরে কেউ অনিয়ম করে থাকলে সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।

অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয়দের দাবি, এতিমদের খাদ্য সহায়তার মতো মানবিক কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রকৃত এতিমখানাগুলো যেন তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা পুরোপুরি পায়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিষয় : অনিয়ম

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে

The Dhaka News Bangla

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬


মতলবে এতিমদের ৪৬ টন চালের অর্ধেকের বেশি গায়েব!

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুলাই ২০২৬

featured Image
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এতিমদের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ৪৬ এতিমখানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় মোট ৪৬ টন চাল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যে ২৫ টনেরও বেশি চাল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান এক টনের পরিবর্তে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছে বলে দাবি করেছে। কোথাও কোথাও চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি নীতিমালারও পরিপন্থী।সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এতিমখানা পরিদর্শনে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম চাল পেয়েছেন।কলাকান্দি ইউনিয়নের নেদায়ে ইসলাম আশিকে মানযুর (রা.) নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ জানায়, এক টন চালের বাজারমূল্য ৫০ হাজার টাকারও বেশি হলেও তাদের হাতে চাল না দিয়ে মাত্র ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বিনন্দপুর মদিনাতুল উলুম মাদ্রাসা ও এতিমখানা, সাতবাড়িয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং সুজাতপুর দরবেশ বাড়ি মাদ্রাসা ও এতিমখানা-এর কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, চালের পরিবর্তে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।এছাড়া জিন নুরাইন ইসলামিয়া মাদ্রাসা, পশ্চিম ইসলামাবাদ মাদ্রাসা, ষাটনল আরাবিয়াতুল উম্মাহ মহিলা মাদ্রাসা, ষাটনল হাফেজ আব্দুল লতিফ দাখিল মাদ্রাসা, দারুল উলুম কাসেমিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, দশানী আল-আমিন আকরামিয়া মাদ্রাসা, সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা, মোহনপুর আল হেরা মহিলা মাদ্রাসা, মুদাফর রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা, মাথাভাঙ্গা মিলারচর মাদ্রাসা ও পাঁচআনী আমিয়া আরাবিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, তারা এক টনের বদলে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি চাল পেয়েছেন।অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, উপজেলার কয়েকটি এলাকায় শুধুমাত্র ডিজিটাল সাইনবোর্ড টানিয়ে এতিমখানার অস্তিত্ব দেখানো হলেও সেখানে এতিম শিশুদের বসবাস বা শিক্ষা কার্যক্রমের কোনো বাস্তব চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানও সরকারি এক টন চালের বরাদ্দপ্রাপ্ত তালিকায় রয়েছে। বিষয়টি বরাদ্দ প্রক্রিয়া ও উপকারভোগী যাচাই নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।এতিমদের জন্য বরাদ্দ চাল আত্মসাতের অভিযোগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী ও প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততার বিষয়টি তারা বিশ্বাস করেন না। তবে তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনো প্রতিনিধি বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে এমন অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।তাদের অভিযোগ, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) অফিস, প্রকৌশল অফিসসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের নানা অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। তারা এসব বিষয়ে দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান।সাড়ে পাঁচানী হোসাইনীয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সভাপতি এবং উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি নুরুল আমিন মাস্টার বলেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী এক টন চাল পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা মাত্র ৬০০ কেজি চাল পেয়েছি। এতিমদের প্রাপ্য চাল আত্মসাৎ অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। বিভিন্ন জায়গায় জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।উপজেলা বিএনপির সভাপতি বশির আহমেদ খান বলেন, এতিমদের চাল আত্মসাতের অভিযোগ অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি ইউএনওর সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা ওসমান গনি বলেন, খাদ্য গুদাম থেকে কখনো আমি নিজে, আবার কখনো অফিসের স্টাফদের মাধ্যমে এতিমখানার প্রতিনিধিদের চাল বিতরণ করা হয়েছে। তবে চাল কম পাওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এমদাদুল হক বলেন, তালিকাভুক্ত প্রতিটি এতিমখানার নামে এক টন করে চালের ডিও ইস্যু করা হয়েছে। সব কাগজপত্র আমাদের কাছে রয়েছে। বরাদ্দ দেওয়ার পর বাইরে কেউ অনিয়ম করে থাকলে সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, এতিমখানাগুলোকে চাল দেওয়ার কথা, টাকা দেওয়ার কোনো বিধান নেই। চাল কম দেওয়ারও সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এদিকে স্থানীয়দের দাবি, এতিমদের খাদ্য সহায়তার মতো মানবিক কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রকৃত এতিমখানাগুলো যেন তাদের প্রাপ্য সরকারি সহায়তা পুরোপুরি পায়, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

The Dhaka News Bangla

সম্পাদক: তাসকিন আহমেদ রিয়াদ 

কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত