কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রাম। এই গ্রামেরই এক চিলতে জমিতে এখন সবুজের সমারোহ। বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে মাত্র ৩০ শতাংশের একটি জমি দূর থেকেই পথচারীদের নজর কাড়ছে। আর কাড়বেই না কেন? সাধারণ চাষিরা যেখানে একই জমিতে এক বা দুটি ফসলের আবাদ করতে হিমশিম খান, সেখানে এই সামান্য জমিতে এক-দুটি নয়, একযোগে আট প্রকারের সবজি চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষক বিল্লাল হোসেন। নিজের মেধা, শ্রম আর সঠিক পরিকল্পনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এখন এলাকায় সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বিল্লাল হোসেনের এই চাষপদ্ধতি বেশ চমৎকার এবং সুপরিকল্পিত। ৩০ শতাংশের পুরো জমিটিকে তিনি প্রথমে ছোট ছোট খণ্ডে ভাগ করে নিয়েছেন। এরপর প্রতিটি খণ্ডে আলাদা আলাদা জাতের সবজির বীজ বুনেছেন। তার এই বৈচিত্র্যময় সবজি বাগানে চোখ মেললেই দেখা যায় হরেক রঙের সমাহার। মাটিতে লতিয়ে চলছে ধুন্দুল ও শসার গাছ, মাচায় দুলছে কচি সবজি। অন্যদিকে যত্নে বেড়ে উঠছে ঢেঁড়স, লাল শাক ও পুঁইশাক। এর পাশেই সবুজ গালিচার মতো বিছিয়ে আছে কলমি শাক ও পাট শাকসহ আরও কয়েক ধরনের পুষ্টিকর শাকসবজি। একই জমিতে এত রূপ আর গুণের সমাবেশ সচরাচর দেখা যায় না।
কৃষক বিল্লালের সাথে কথা বলে জানা গেল, তার এই ব্যতিক্রমী চাষাবাদের পেছনের গল্প। তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে জানান যে, মহান আল্লাহর অশেষ রহমতে এবার তার প্রতিটি খণ্ডের সবজির ফলনই বেশ ভালো হয়েছে। তবে আট প্রকারের সবজি একসাথে চাষ করার কারণে তার ব্যস্ততা বেড়েছে বহুগুণ। বিল্লাল বলেন, যেহেতু একই জমিতে এতগুলো জাতের সবজি রয়েছে, তাই একেকটির পরিপক্ব হওয়ার সময় একেক রকম। এই কারণে তাকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো সবজি তোলার জন্য ক্ষেতে নামতে হয়। কোনোদিন ক্ষেত থেকে শুধু এক প্রকারের সবজি তোলেন, আবার কোনো কোনো দিন দুই থেকে তিন প্রকারের সবজি একসাথে সংগ্রহ করতে হয়। আর ভোরের আলো ফুটতেই সেই তরতাজা সবজি নিয়ে তাকে ছুটতে হয় স্থানীয় বাজারে।
সবজি বিক্রির অভিজ্ঞতা নিয়ে বিল্লাল বেশ সন্তুষ্ট। বাজারে তার ক্ষেতের সবুজ ও সতেজ সবজির চাহিদাও দারুণ। তিনি জানান, প্রতিদিন বাজারে কিছু না কিছু বিক্রি করতে পারায় তার হাতে সবসময়ই নগদ টাকার জোগান থাকছে। বর্তমান বাজারে সবজির দামও বেশ ভালো, যার ফলে প্রতিদিনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে দিনশেষে এক বুক তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফেরেন তিনি।
বিল্লালের এই চাষপদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অত্যন্ত কম পুঁজি এবং কম ঝুঁকিতে অধিক লাভ নিশ্চিত করা। তিনি জানান, এই মিশ্র সবজি চাষে তার আর্থিক বিনিয়োগ বা পুঁজির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য। কিন্তু সেই তুলনায় লাভের পরিমাণ অনেক বেশি। বাজারে কোনো একটি সবজির দাম কিছুটা কম থাকলেও অন্যটির ভালো দাম থাকায় লোকসানের কোনো সুযোগ থাকে না।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে বহু কৃষকের স্বপ্নের সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, পচন ধরে নষ্ট হয়ে গেছে কোটি টাকার ফসল। মেহার গ্রামের অনেক চাষিও এই অকাল দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু ভাগ্য যেন বিল্লাল হোসেনের সহায় ছিল। তিনি দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে তুলনামূলক একটু উঁচু জমিতে নিজের এই সবজি বাগানটি গড়ে তুলেছিলেন। ফলে অতিবৃষ্টির তীব্র জলজট তার ক্ষেতকে স্পর্শ করতে পারেনি। অন্যদের মাথায় হাত পড়লেও উঁচু জমির কারণে বিল্লালের সবজি ক্ষেতের তেমন কোনো ক্ষতিই হয়নি, বরং বৃষ্টির পর তার গাছগুলো আরও সতেজ হয়ে উঠেছে।
স্বল্প জমিতে কীভাবে আধুনিক ও বুদ্ধিদীপ্ত উপায়ে কৃষিকে লাভজনক করা যায়, বিল্লাল হোসেন যেন তারই এক জীবন্ত উদাহরণ। তার এই অভাবনীয় সাফল্য দেখে মেহার গ্রামসহ চান্দিনার আশপাশের অনেক বেকার যুবক ও সাধারণ চাষিরা এখন উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। অনেকেই তার ক্ষেত পরিদর্শনে আসছেন এবং কীভাবে এক জমিতে এমন বহুবিধ চাষ করা যায়, তার পরামর্শ নিচ্ছেন। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যে ভাগ্যের চাকা ঘোরানো সম্ভব, কৃষক বিল্লাল হোসেন তা মেহার গ্রামের মাটিতে পরম মমতায় ফলিয়ে দেখিয়েছেন।

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে