কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ফসলের মাঠজুড়ে এখন সোনালী স্বপ্নের হাতছানি। দিগন্তজোড়া ফসলের ক্ষেত দেখে মনে হচ্ছে যেন কেউ সবুজ গালিচায় সোনালী আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। চান্দিনা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় প্রায় ১০ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন ধানের শিষগুলো বাতাসে দুলছে। অনুকূল আবহাওয়া আর সময়মতো সার ও সেচ সুবিধার কারণে এবার প্রতিটি ক্ষেতেই ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। কৃষকের চোখে-মুখে এখন একরাশ তৃপ্তি। সারাবছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর ধানের এই প্রাচুর্য তাদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। কিন্তু এই হাসির আড়ালে এখন চিন্তার ভাঁজও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
চান্দিনা উপজেলার মাটি অত্যন্ত উর্বর এবং কৃষিবান্ধব। এখানকার কৃষকরা মূলত ধান চাষের ওপরই নির্ভরশীল। এখানকার মাটি এবং জলবায়ু ধান উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী হওয়ায় ঐতিহাসিকভাবেই কৃষকরা ধান চাষে অভ্যস্ত। তবে বর্তমানে মাঠভরা সোনালী ফসল ঘরে তোলার আগমুহূর্তে এক তীব্র সংকটের মুখে পড়েছেন তারা। ধান কাটার জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাব এখন কৃষকদের প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেতেই ধান পেকেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধান কাটার উপযোগী হয়েছে। কিন্তু মাঠের ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় কামলা বা শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্রামবাংলার চিরচেনা এই সময়ে ধান কাটার ধুম পড়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে যেন কিছুটা স্থবিরতা বিরাজ করছে। কৃষকরা বলছেন, মাঠে ফসল থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস এবং আকাশের মেঘাচ্ছন্ন রূপ কৃষকদের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। যেকোনো সময় কালবৈশাখী বা অসময়ের বৃষ্টি হানা দিতে পারে। প্রকৃতির এই অনিশ্চয়তার হাত থেকে কষ্টের ফসল রক্ষা করতে কৃষকরা এখন মরিয়া। দ্রুত ধান ঘরে তুলতে না পারলে যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তা তাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।
যদি সময়মতো পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যেত, তবে এই ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি এবং গ্রামে কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। অনেক কৃষক নিজেরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন, কিন্তু বিশাল মাঠের ধান একা হাতে তোলা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সহযোগিতা এবং আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা। কম্বাইন হারভেস্টার বা ধান কাটার যন্ত্রের ব্যবহার এক্ষেত্রে বড় সমাধান হতে পারে। কিন্তু পর্যাপ্ত যন্ত্রের অভাবে সাধারণ কৃষকরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চান্দিনার কৃষকরা জানান, তারা কেবল নিজেরা কঠোর পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত নন, বরং তারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার বড় একটি অংশীদার। কিন্তু মৌসুমি ধান কাটার সময় যদি শ্রমিক সংকটের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে প্রভাব পড়ার শঙ্কা থাকে। তাই ধান পাকার এই মুহূর্তে শ্রমিক সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের চোখের এই সোনালী স্বপ্ন যেন প্রকৃতির দুর্যোগে ঝরে না পড়ে, সেই প্রত্যাশাই এখন এলাকাবাসীর। মাঠভরা ফসল যেন হাসি মুখে কৃষকের গোলায় ওঠে, এটিই এখনকার প্রধান দাবি। অকাল দুর্যোগের আগেই ধান ঘরে তোলার জন্য কৃষকরা এখন প্রহর গুনছেন এবং আকাশের পানে তাকিয়ে দোয়া করছেন, যেন প্রকৃতি অন্তত কয়েকটা দিন তাদের সহায় হয়। উর্বর মাটি আর পরিশ্রমী কৃষকের এই জনপদে বোরো মৌসুমের সাফল্য যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেদিকেই সবার দৃষ্টি।

রোববার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে