সম্প্রতি কুমিল্লায় ঘটে যাওয়া অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে চার অভিযুক্ত তুহিন, ফাহাদ, কামরুল ও সিয়ামের মধ্যে দুজনের বয়সই ১৮ বছরের নিচে। যে কারণে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের কারাগারে না পাঠিয়ে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। আর এতেই সমাজের একাংশ প্রশ্ন তুলছে যে, এমন নৃশংস হত্যাকারীদের কারাগারে না পাঠিয়ে সংশোধনাগারে পাঠানো হলো কেন? একটা শিশুকে যারা হত্যা করতে পারে, তারা কেন এই অপরাধের জন্য দায়ী নয়?
প্রত্যেকটি লিগ্যাল প্রিন্সিপাল ও ধারার পেছনে নির্দিষ্ট লিগ্যাল ফিলোসফি থাকে। আইনি দর্শন বা ক্রিমিনোলজির কোন দৃষ্টিকোণ থেকে শিশু ও কিশোর অপরাধের দায় একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে, একটা শিশু বা কিশোর কেন অপরাধী হয়ে ওঠে। ক্রিমিনোলজির বিভিন্ন তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন কিশোর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. ফিজিক্যাল: একজন শিশু যত বড় অপরাধ, যত জটিলভাবেই করুক না কেন, তবুও সে একজন শিশু। একজন শিশু খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছে—এটা কখনোই নির্দেশ করে না যে সে শারীরিকভাবে প্রাপ্তবয়স্ক। তাই একজন শিশুর জটিল কোনো অপরাধের দায় একজন প্রাপ্তবয়স্কের মতো কখনোই শুধুমাত্র তার নিজের নয়।
২. সাইকোলজিক্যাল: উঠতি বয়সের কিশোরেরা সাধারণত খুবই ইমোশনাল হয়ে থাকে। তারা তাদের সাইকোলজিক্যাল মাইন্ডসেট দিয়েই পুরো সমাজকে চিন্তা করে এবং মানসিক সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো কিছু করাকে বৈধ মনে করতে পারে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ‘বউলি’ তাঁর বইতে লিখেছেন, শিশু-কিশোররা যখন সহজ পথে তাদের মৌলিক আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করতে পারে না, তখন তারা ভুল পথ বেছে নেয়।
৩. সঠিক পেরেন্টিংয়ের অভাব: একটি শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য যথাযথ প্রতিপালন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশু যখন পরিবার থেকে সঠিক শিক্ষা না পায়, তখন সে অন্যান্য ভুল পথের দিকে ঝুঁকতে থাকে।
৪. অভিভাবকদের ক্রিমিনাল টেন্ডেন্সি: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি এটি। আমাদের সমাজের অভিভাবকরা সাধারণ আইন, যেমন—সিগন্যাল না মানা, ছোটখাটো চুরি করা, ইভটিজিং করা ইত্যাদি আইন অমান্য করাকে স্বাভাবিক মনে করেন। যে কারণে শিশুরা অবচেতন মনে আইন ভাঙাকে খুব বড় কোনো অপরাধ মনে করে না, যা থেকে তারা আস্তে আস্তে বড় অপরাধের দিকে ঝুঁকতে থাকে।
৫. খারাপ সঙ্গী: ক্রিমিনোলজিস্ট হেইলি এবং বংগারের একটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ৬২% কিশোর অপরাধ খারাপ সঙ্গীদের প্ররোচনায় হয়ে থাকে। খারাপ সঙ্গীদের প্রভাবে একজন শান্ত স্বভাবের শিশুও ভায়োলেন্ট হয়ে উঠতে পারে।
৬. কালচারাল ফ্যাক্টর: কোনো সমাজ যদি কালচারালি অপরাধপ্রবণ হয়ে থাকে, তাহলে সেই সমাজে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরেরাও অপরাধপ্রবণ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
৭. সৃজনশীলতার অভাব: একজন শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য সৃজনশীল কার্যক্রম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা, খেলাধুলা অথবা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট সৃজনশীল উপকরণ থাকা উচিত। কিন্তু দেখা যায়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাটাই মুখস্থনির্ভর হয়ে গেছে; সৃজনশীলতার তেমন কোনো সুযোগই নেই।
একজন শিশুকে এই ফ্যাক্টরগুলো থেকে দূরে রাখা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাইকোলজিক্যাল অস্থিতিশীলতা, সঠিক প্যারেন্টিংয়ের অভাব, বাবা-মায়ের অপরাধপ্রবণতা, শিশুকালে খারাপ সঙ্গ, কালচারালি অপরাধপ্রবণ সমাজ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার অভাবে যদি কোনো শিশু অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে সেই দায় কেবলমাত্র ওই শিশুর নয়। এই সমাজ ও রাষ্ট্রের নেগলিজেন্সই এর কারণ; এর লায়াবিলিটিও রাষ্ট্রকে নিতে হয়।
এ বিষয়ে আরও বিস্তারিতভাবে জানতে চাওয়া হয়েছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক (মাসুম)-এর কাছে।
প্রশ্ন- ১: একজন শিশু যদি অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে, তাহলে এই দায় কি শুধুই শিশুর? সমাজ এবং রাষ্ট্র কি কোনোভাবে এই দায় এড়াতে পারে?
উত্তর: একটা শিশুর সামাজিক জীব হয়ে ওঠার যে প্রক্রিয়া, তার পুরোটাই সে সমাজের মানুষের কাছ থেকেই শেখে। সেক্ষেত্রে একজন শিশু জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। কোনো মানুষই জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। আমরা ক্রিমিনোলজির ভাষায় যদি বলি, প্রত্যেক মানুষই ইনোসেন্ট হিসেবে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে। অপরাধী তাকে বানায় কে? ওই সমাজ, রাষ্ট্র অথবা তার পরিবার।
পরিবার থেকেই কিন্তু একটা শিশুর প্রথম শিক্ষা শুরু হয়। তাহলে প্রথমে পরিবারের ব্যর্থতা, সেকেন্ড হচ্ছে সামাজিক ব্যর্থতা এবং তৃতীয় ফেজে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। তো, কালেক্টিভ ব্যর্থতার জাস্ট একটা রিফ্লেকশন হচ্ছে একটা শিশুর পথভ্রষ্ট বা বিপথগামী হওয়া।
একটা শিশুকে একটা পরিপূর্ণ সামাজিক জীব হিসেবে এবং নৈতিক-আদর্শিক মানুষ হিসেবে তৈরি করার প্রথম দায়িত্ব পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের। তাহলে যখন একটা শিশু আদর্শিক এবং নৈতিক মানুষ হিসেবে তৈরি না হয়ে বিপথগামী হয়, তখন এই দায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। তাই একটা শিশুর করা অপরাধের জন্য শুধুমাত্র তাকে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেওয়া যায় না।
প্রশ্ন–২: অনেকেই দাবি করছেন যে, এখনকার শিশুরা ১৮ বছরের আগেই অনেক ম্যাচিউর হয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন অপরাধ করছে। তাই শিশুর বয়সসীমা ১৮-এর বদলে ১৫ বা ১৬ হওয়া উচিত। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?
উত্তর: মেডিক্যাল সায়েন্স অনুযায়ী, একটা শিশুর মানসিক বৃদ্ধির জন্য মিনিমাম ১৮ বছর হওয়া প্রয়োজন এবং এটি বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তাই কোনো শিশু যদি ১৮ বছরের আগেই জটিল কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তার দায় বয়সের নয়। ওই শিশুর সামাজিক অবস্থা আমরা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, যে কারণে ১৮ বছরের আগেই শিশুটি অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই শিশুদের বয়সসীমা কমানো উচিত এই কথা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়।
তিনি আরও বলছেন, “আইন সবসময় ইকুয়ালিটিতে বিশ্বাস করে। ৫০ বছর আগের শিশুরা যদি ১৮ বছর পর্যন্ত আইনি সুরক্ষা পেয়ে থাকে, তাহলে এখনকার শিশুরা কেন ১৫ বা ১৬ বছর পর্যন্ত পাবে? এখন কি সায়েন্টিফিক্যালি এটা প্রমাণিত যে ১৬ বছরেই একটা শিশুর সম্পূর্ণ মানসিক বিকাশ ঘটে যায়? উত্তর হলো, না। তাহলে এখনকার শিশুদের প্রতি বৈষম্য করা হবে।
যদি এখনকার শিশুরা প্রযুক্তিগত কারণে একটু বেশি চালাক হয়ে থাকে, সেটা কিন্তু তার মানসিক বিকাশ নয়। প্রযুক্তিগত কারণে কোনো শিশু একটু অ্যাডভান্স হয়ে গেলে আমাদের প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে; শিশুদের বয়সের সীমা কমিয়ে ফেলা কোনোভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়।”

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে