লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধের হিসাব গায়েব করতে পরিকল্পিতভাবে অগ্নিকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের ইনচার্জ ও সিনিয়র স্টাফ নার্স কুসুম রানী পাইকের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার (২ মে) ভোররাতে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের ওষুধ স্টোর রুমে ঘটা এই রহস্যজনক আগুনে অন্য সব মালামাল অক্ষত থাকলেও পুড়ে গেছে কেবল রোগীদের ওষুধের হিসাব সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্ট্রার খাতাটি। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে একই কর্মস্থলে থাকা এই নার্সের গড়ে তোলা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অনিয়ম ঢাকতেই এই ‘অগ্নি নাটক’ সাজানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘটনার সময় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। পল্লী বিদ্যুৎ অফিস নিশ্চিত করেছে যে, সেদিন ভোর সাড়ে চারটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত হাসপাতালে লোডশেডিং চলছিল। এছাড়া স্টোর রুমের বৈদ্যুতিক বোর্ড ও তারের সঞ্চালন লাইন অক্ষত থাকায় শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লাগার দাবিটি ভিত্তিহীন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কুসুম রানী পাইক তার নিজস্ব লোক ব্যবহার করে এই আগুন লাগিয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি ওষুধ রোগীদের না দিয়ে গোপনে বাইরে বিক্রি করে দেওয়ার দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেই চুরির হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হয়েই প্রমাণ লোপাটের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে আগুনের পথ।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, ২৬ বছর ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে কুসুম রানী পাইক এক প্রকার ‘মগের মুল্লুক’ কায়েম করেছেন। বিশেষ করে ডেলিভারি রোগীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি বিগত ২৬ বছরে অন্তত কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। তার প্রভাবের কাছে অন্য নার্স ও কর্মচারীরা তটস্থ থাকেন সবসময়। এই বিশাল দুর্নীতির সাম্রাজ্য রক্ষা করতে এবং সরকারি ওষুধের হিসাবের গরমিল ঢাকতে রেজিস্ট্রার খাতা পোড়ানোর বিষয়টি এখন টক অব দ্য টাউনে পরিনত হয়েছে । এমনকি ঘটনার পর স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী ইমরান হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অগ্নিকাণ্ডকে সরাসরি কুসুম রানীর পরিকল্পিত কাজ বলে দাবি করেন এবং এর সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানান।
এদিকে,
হাসপাতালে আগুন লাগা এবং ওষুধের হিসাব সংরক্ষণ খাতা (রেজিস্ট্রার) পুড়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে মেডিকেল অফিসার ডা. সোহেল রানা, আতায়ে রাব্বি এবং আবাসিক মেডিকেল অফিসার আমিনুল ইসলাম মঞ্জু সহ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ওইদিনই থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি জিডি করা হয়েছে। । তদন্তু কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করার পর সত্যতা পাওয়া গেলে কুসুম রানী পাইকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে তদন্তে কমিটিতে থাকা মেডিকেল অফিসার ডা. আতায়ে রাব্বির কাছে তদন্তের অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি হতবাক হয়ে বলেন, আমাকে তদন্ত কমিটিতে সদস্য করা হয়েছে অথচ এখনো আমি জানতেই পারিনি। তিনি বলেন, চিঠি হাতে পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে ওয়াকিবহাল মহলের মতে এসব গড়িমসি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা বা তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টাকেই ইঙ্গিত করে।
এবিষয়ে বক্তব্য জানতে সরেজমিন হাসপাতালে গিয়ে অভিযুক্ত৷ সিনিয়র স্টাফ নার্স ও ইনচার্জ কুসুম রানী পাইকের দেখা মেলেনি ; মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এবিষয়ে কমলনগর থানার ওসি ফরিদুল আলম জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একজন অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায়
হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে এখন একটাই দাবি অদৃশ্য খুঁটির জোরে পার পেয়ে যাওয়া কুসুম রানী পাইকের বিরুদ্ধে এবার যেন কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ওষুধ চুরির আসল রহস্য উদঘাটন করা হয়।

সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ মে ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে