শাহজালাল থার্ড টার্মিনালে ‘আরেক বালিশ-কাণ্ডের’ অভিযোগ!
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রকল্পে অনুমোদনবিহীন ব্যয়, অতিরিক্ত বিল পরিশোধ এবং ভেরিয়েশনের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ব্যবহৃত বিভিন্ন গাছের মূল্য বাজারদরের তুলনায় অনেক বেশি দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকশ টাকার চারা গাছের মূল্য প্রকল্প নথিতে কয়েক হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এ খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি গাছের পরিচর্যার জন্য আরও প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।বিমানবন্দরসংলগ্ন কয়েকটি নার্সারির মালিকরা দাবি করেছেন, একই ধরনের গাছ সাধারণত ২০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। ফলে প্রকল্পে মূল্য নির্ধারণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পে অতিরিক্ত কাজের নামে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই ব্যয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সীমিত পরিমাণ ভেরিয়েশন অনুমোদনের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।এছাড়া পুকুর নির্মাণ, মাটি পরিবহন, ডিজেল পাম্প, ইউপিএস সরবরাহ, জ্বালানি ব্যয় এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত বিল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে চুক্তির বাইরে ব্যয় দেখিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের আয়োজনেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল চুক্তিতে এ ধরনের ব্যয়ের উল্লেখ না থাকলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, নিরীক্ষায় চিহ্নিত অনিয়মগুলো পরবর্তী সময়ে অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হলে তা জবাবদিহি ও সুশাসনের জন্য নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হবে।এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলমের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যথায় সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে।বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ওঠা সব অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কোনো দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত ছাড়া নিষ্পত্তি করা হবে না।অন্যদিকে, বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ মফিদুর রহমান বলেছেন, প্রকল্পের ব্যয়, ভেরিয়েশন ও নকশা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং অর্থায়নকারী সংস্থার সুপারিশের ভিত্তিতে হয়েছে। তাই প্রতিটি অভিযোগ প্রকল্পের নথি ও চুক্তির আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে অনুমোদিত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। জাপানের জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি।