ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ৩ থেকে ৪ লাখ প্রাণহানির শঙ্কা!
ফিলিপাইন ও আশপাশের অঞ্চলে সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশেও বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে অল্প ব্যবধানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা আরও বেড়েছে।ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে ৭ থেকে ৭.৫ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প যে কোনো সময় ঘটতে পারে। এমন একটি ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার হাজার হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে এবং প্রাণহানি ৩ থেকে ৪ লাখে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ হবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণমান এবং ভবন নির্মাণে নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা। প্রকৌশলবিদদের একটি বহুল প্রচলিত বক্তব্য হলো “ভূমিকম্প মানুষকে হত্যা করে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে হত্যা করে।”যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতি বছর গড়ে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ১৫ থেকে ১৬টি বড় ভূমিকম্প ঘটে।বিশেষজ্ঞরা জানান, ভূমিকম্পের মাত্রা (Magnitude) এবং তীব্রতা (Intensity) এক বিষয় নয়। তবে উভয়ই বেশি হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ এমন একটি ভূকম্পনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবসময়ই রয়েছে। ইতিহাস বলছে, ১৭৬২ সালে আরাকান অঞ্চলে প্রায় ৮ মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। যদিও এর অর্থ এই নয় যে একই মাত্রার ভূমিকম্প এখনই হবে, তবে কখন ঘটবে সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে কাছাড়ে ৭.৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল আর্থকোয়েক ৭.১, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা বিবেচনায় বাংলাদেশে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প যে কোনো সময় ঘটতে পারে।তিনি জানান, বাংলাদেশের চারপাশে একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে। এর মধ্যে ডাউকি ফল্ট, আরাকান ফল্ট এবং নোয়াখালী-সিলেট ও সিলেট-কাছাড় অঞ্চলের প্লেট বাউন্ডারিগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহন করছে।মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, বড় প্রশ্ন হলো, এমন একটি দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতটা পর্যাপ্ত?জাইকা (JICA) ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (CDMP) এক জরিপ অনুযায়ী, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। তবে কোন ভবনগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো নেই।তিনি জানান, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টিনশেড, ছোট ভবন বা বস্তি, যেখানে ধসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কিন্তু অবশিষ্ট প্রায় ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবনের মধ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তবে আধুনিক নির্মাণমান নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করা, বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নাগরিকদের দুর্যোগ প্রস্তুতি বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।