জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার কানাইপুকুর পাখি কলোনি রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ের সম্মাননা পেলেন মোহসেনা বেগম। তিনি ‘বিবিসিএফ অ্যাওয়ার্ড-২০২৫’ অর্জন করেছেন। মোহসেনা বেগম ওই গ্রামের পাখি কলোনির সভাপতি এবং বানাইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।গত ৬ ডিসেম্বর (শনিবার) ঢাকায় আগারগাঁওয়ে বন ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের হাত থেকে তিনি এই সম্মাননা স্মারক ও ক্রেস্ট গ্রহণ করেন।সারাজীবন কোমলমতি শিশুদের বর্ণমালা আর নীতি-নৈতিকতার পাঠ দিয়েছেন যিনি, অবসরের পর তিনি এখন প্রকৃতির পাঠশালায় মগ্ন। চক-ডাস্টারের ব্যস্ত জীবন থেকে অবসর নিলেও মোহসেনা বেগমের দায়িত্ববোধ ফুরিয়ে যায়নি। বরং স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর মায়া ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতির আঙিনায়। বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে এবং গ্রামবাসীর সহযোগিতায় কানাইপুকুর গ্রামটি হয়ে উঠেছে হাজারো অতিথি পাখির নিরাপদ অভয়ারণ্য।আব্দুস সামাদ মন্ডল এবং আব্দুস সোবহান মন্ডলের পারিবারিক গোরস্থান এবং জমির উপর প্রায় পাঁচ বিঘা পরিমাণ জায়গায় বড় পুকুরপাড়ের গাছগুলোই শামুকখোলসহ নানান বিরল প্রজাতির পাখির একমাত্র আশ্রয়। ব্যবসায়িক লাভ বা জ্বালানির প্রয়োজনে সাধারণত মানুষ গাছ কেটে ফেলে। পাখিদের সুরক্ষার বিষয়ে মোহসেনা বেগম বলেন, “পাখিদের আবাসস্থলকে নিরাপদ রাখতে আমরা পুকুরপাড়ের গাছগুলো কখনও কাটব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ফলে যতদিন ইচ্ছে পাখিরা সেখানে নিরাপদে বাস করতে পারবে।”তাঁর এই একটি সিদ্ধান্ত হাজারো পাখির প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে। তিনি মনে করেন, গাছ থাকলে পাখি থাকবে, আর পাখি থাকলেই প্রকৃতি বাঁচবে। এখন পুরো পুকুরপাড় জুড়ে পাখির কলকাকলি। মোহসেনা বেগম জানান, কেবল তিনি নন, নিরাপত্তা দিতে গ্রামের সাধারণ মানুষরাও পাখিগুলোকে আগলে রেখেছেন। বাইরের কেউ যাতে পাখিদের বিরক্ত বা শিকার করতে না পারে, সেদিকে তিনি গ্রামের মানুষদের, বিশেষ করে শিশু কিশোর দের গত ৩০ বছর ধরে সচেতন করে আসছেন।স্কুলের ক্লাসরুম থেকে বিদায় নিলেও মোহসেনা বেগম এখন প্রকৃতির বিশাল পাঠশালার এক মুগ্ধ তত্ত্বাবধায়ক। ইট-কাঠের উন্নয়নের ভিড়ে যখন সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন তিনি আগলে রেখেছেন হাজারো পাখির সংসার। জয়পুরহাটের এই নিভৃত পল্লীতে তিনি যা করছেন, তা কোনো বড় স্লোগান নয়, বরং নীরব ভালোবাসার এক অনন্য গল্প। তাঁর এই মমতা বেঁচে থাকুক কানাইপুকুরের প্রতিটি পাখির ডানায়।