অভিজ্ঞতার তিক্ততা থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত
ভোলা জেলার লালমোহন থানার এক সাধারণ গ্রামের ছেলে শাহীন আলম। শৈশব কেটেছে সবুজ গ্রাম, সৎ মানুষ আর পারিবারিক উষ্ণতার মাঝে। তাঁর ভাষায়, “আমার শৈশব ও বেড়ে ওঠা বলতে আমার ভালো লাগে বেশ আনন্দই পাই। আমি গ্রাম এর ছেলে— প্রিয় বাবা-মা, ভাইবোন আর ভালো প্রতিবেশীদের সঙ্গে বড় হয়েছি।” এই গ্রাম্য পরিবেশ থেকেই শুরু তাঁর স্বপ্ন দেখা, সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।শাহীন আলমের উদ্যোক্তা জীবনের শুরুটা এসেছে এক ব্যতিক্রমী তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে। ছোটবেলা থেকেই তিনি কারিগরি শিক্ষা পছন্দ করতেন। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি এমন একটি কাজ করতে চেয়েছিলেন, যা আয়ও দেবে এবং সমাজে কিছু অবদান রাখার সুযোগও তৈরি করবে। ড্রাইভিং শেখার ইচ্ছে থেকে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিতে যান। কিন্তু সেখানে পান অপেশাদারিত্ব আর অবহেলা। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে বদলে দেয়। তিনি বলেন, “আমি যেখানেই গেছি, তেমন তৃপ্তি পাইনি। তখনই প্রতিজ্ঞা করেছি— আমি শুধু নিজে ড্রাইভিং করবো না, আমি ড্রাইভিং মাস্টার হবো।”এই প্রতিজ্ঞা থেকেই জন্ম নেয় প্রিমিয়াম ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুল। প্রথমে মাত্র একটি গাড়ি নিয়ে শুরু। কিন্তু পরিশ্রম, আন্তরিকতা আর দায়িত্ববোধে আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানে ১০টি গাড়ি দিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁর প্রথম শিক্ষার্থী ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। সেই প্রথম ছাত্রের গল্প আজও মনে গেঁথে আছে শাহীন আলমের— “তিনি আমার লাকি কাস্টমার ছিলেন। শেখার পর তিনি নিজে গাড়ি কিনলেন, তারপর তাঁর পরিবারের আরও তিনজনকে আমার কাছে পাঠালেন।” এই এক পরিবার থেকেই শুরু হয় তাঁর সাফল্যের যাত্রা।১৬ বছরের অভিজ্ঞতায় তিনি তৈরি করেছেন মডিউল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা— যা নতুনদের জন্য সহজ, কার্যকর এবং নির্ভরযোগ্য। শুধু ড্রাইভিং নয়, ইঞ্জিনের প্রাথমিক কাজও তিনি শেখান। এতে শিক্ষার্থীরা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষায়, “উন্নত মানের শেখানোর মন-মানসিকতা থাকলে যেকোনো মানুষ সহজে ভালো ড্রাইভিং শিখতে পারে।”আজ পর্যন্ত তিনি সফলভাবে ১২,৯০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁদের অনেকে দেশে-বিদেশে কাজ করছেন সু-নামের সাথে। কারণ তাঁর প্রতিষ্ঠান বিআরটিএ নিবন্ধিত এবং তিনি নিজেও BRTA-সার্টিফাইড প্রশিক্ষক। ফলে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ তাঁর কাছে ড্রাইভিং শিখতে আসে।ব্যবসার পাশাপাশি সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধও শাহীন আলমের সাফল্যের বড় অংশ। তিনি জানান, “করোনার পর গরিব ও অসহায় পরিবার থেকে কেউ এলে সম্পূর্ণ বিনা খরচে ফুল কোর্স করাই। আগামীতেও এটা চলমান থাকবে।” এছাড়া এসএসসি পাস বেকার শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি সবসময় ২৫% ছাড় দিয়ে থাকেন। নারীদের জন্যও তিনি আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন।উদ্যোক্তা জীবনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন, “যত বড় বাধাই আসুক, হাল ছাড়া যাবে না। পাহাড়ের সমান বাধা এলে পাহাড়ও পার হতে হবে।” অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা তাঁর কাছে সাফল্যেরই আরেক পথ।ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর লক্ষ্য স্পষ্ট— প্রিমিয়াম ড্রাইভিং স্কুলকে দেশের সেরা ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম, ত্যাগ আর আন্তরিকতা থাকলে সফলতা একসময় নিজেই এসে ধরা দেয়।একটি গ্রামের ছেলে থেকে দেশের অন্যতম সফল ড্রাইভিং প্রশিক্ষক— শাহীন আলমের গল্প শুধু অনুপ্রেরণার নয়, অধ্যবসায়েরও এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।শুভ্র/