নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অধিকাংশই এখন পরিত্যক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ। ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে, দরজা-জানালা নেই, বর্ষায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে।
প্রায় নব্বইয়ের দশকে নির্মিত এসব ক্লিনিকের প্রায় ৯৮ শতাংশই সংস্কার অযোগ্য হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অবকাঠামো সংকটে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাধ্য হয়ে কখনো আশপাশের বাড়ির বারান্দা, কখনো দোকানের সামনে বসে সেবা দিচ্ছেন। এতে প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
জানা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলটির সাত লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। যদিও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একেকটি গ্রাম ১৫-৪০ কিলোমিটার দূরত্বে। দ্বীপের ভেতরে আরো ২০-২২টি ছোট দ্বীপ রয়েছে। তাছাড়া খাল, নদী পেরিয়ে এসে চিকিৎসা নেয়াও মুশকিল হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। তবে তিন দশকের বেশি সময় আগে নির্মাণ করা এসব অবকাঠামো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে ৪১টি ক্লিনিক পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ব্যতিক্রম শুধু তমরদ্দি আবদুল হাকিম কমিউনিটি ক্লিনিক। সেটিতে কিছুটা সংস্কার হচ্ছে। ক্লিনিকগুলোতে যদি প্রান্তিক মানুষ সেবা পায়, সেক্ষেত্রে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও রোগীর চাপ কমবে। একই সঙ্গে ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকারের যে চেষ্টা তাও সফল হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, কমিউনিটি ক্লিনিক পুনর্নির্মাণ করে সচল করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সরজমিনে দেখা গেছে, বুড়িরচর ইউনিয়নের আলতাফ হোসেন কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে ‘চিকিৎসায় যক্ষ্মা হয় ভালো’ লেখা সাইনবোর্ড থাকলেও ভবনটি নিজেই জরাজীর্ণ। ছাদের অধিকাংশ পলেস্তারা খসে পড়েছে, চারপাশে জঙ্গল, ভেতরে প্রবেশের উপযোগী পরিবেশ নেই। পাঁচ বছর ধরে এমন অবস্থায় পাশের একটি বাড়ির বারান্দায় সেবা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
ক্লিনিকটির স্বাস্থ্য সহকারী নুসরাত নাজনিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। দরজা-জানালা ভেঙে গেছে। একবার পলেস্তারা খসে পড়ে একজন কর্মী আহত হন। বর্ষায় ভবনের ভেতরে হাঁটুসমান পানি থাকে। নিজেদের উদ্যোগে কিছু মেরামত করা হলেও তা টেকেনি। বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে, কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
শুধু আলতাফ হোসেন ক্লিনিক নয়, আলী আজ্জম, নাঈম উদ্দিন, আবদুল হাকিম ও আবদুল মান্নান কমিউনিটি ক্লিনিকসহ অন্তত ২০ থেকে ৩০ টি কেন্দ্রে একই চিত্র মিলেছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৪২টি কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে। কিন্তু একটি ক্লিনিকেও বসার উপায় নেই। এসব ক্লিনিকে প্রান্তিক নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিদিন গড়ে একেকটি ক্লিনিকে ৫০-১০০ জন সেবা নিতে আসেন। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, জ্বর-সর্দি-কাশি, চর্মরোগ, এজমা রোগে আক্রান্ত রোগী বেশি আসেন। কিন্তু ক্লিনিকগুলো ভালো না থাকায় ওষুধ নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে স্বাস্থ্য কর্মীদের। রাখতে হচ্ছে অন্যদের ঘরে বা দোকানে। এ অবস্থায় সেবা প্রত্যাশীও কমে গেছে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও কিশোরীরা অন্যের বাড়িতে কিংবা দোকানে সেবা নিতে নিরাপদ বোধ করেন না।
আবদুল হাকিম কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্য সহকারী সাজেদা বেগম জানান, এ ক্লিনিকে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি গর্ভবতী নারীদের স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়। দুই মাস আগে সংস্কার শুরু হলেও ঠিকাদার কাজ বন্ধ করে চলে যান। বর্তমানে দরজা-জানালা খোলা, ভবনের অবস্থা আরো নাজুক। প্রতিটি ক্লিনিকে জনবল থাকলেও ভবনের কারণে নিয়মিত সেবা ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রতিটি ক্লিনিকে ৫০ থেকে ১০০ জন রোগী আসেন। গর্ভবতী মা, শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আসেন। তবে অন্যের বাড়ি বা দোকানে সেবা নিতে গিয়ে অনেকে অস্বস্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। এতে রোগীর সংখ্যা কমে গেছে।
চরকিং ইউনিয়নের নাঈম উদ্দিন ক্লিনিকে সেবা নিতে আসা পারভীন আক্তার নিশু জানান, সাত বছর ধরে তাদের ক্লিনিক বন্ধ। পাশের বাড়িতে গিয়ে সেবা নিতে হয়। অনেক কথা খোলামেলা বলা যায় না। দ্রুত ক্লিনিক পুনর্নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় শিক্ষক মাছুম বিল্লাহ বলেন, প্রান্তিক মানুষ যদি কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা পায়, তবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চাপ কমবে এবং সরকারের তৃণমূল স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম সফল হবে। ভবনগুলো পুনর্নির্মাণ ছাড়া বিকল্প নেই।
তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মানসী রানী সরকার বলেন, ক্লিনিকগুলো মেরামতযোগ্য নয়। পুনর্নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। রোগীরা নিরাপদ বোধ না করায় সেবাগ্রহণ কমেছে।
একই কথা বলেন নোয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মরিয়ম সিমি। তিনি জানান, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ উদ্দিন বলেন, একাধিক ক্লিনিক পরিদর্শন করা হয়েছে। পুনর্নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে, কয়েকটির কাজ শেষ পর্যায়ে। বাজেট পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। তবে কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে সময়সীমা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

রোববার, ০৮ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে