কুমিল্লার দেবীদ্বারে প্রকাশ্য দিবালোকে হাসপাতাল থেকে নবজাতক অপহরণের যে অভিযোগ প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তোলে, শেষ পর্যন্ত তা বেরিয়ে আসে এক মায়ের সাজানো নাটক হিসেবে। নিজের ২৭ দিন বয়সী কন্যাশিশুকে টাকার বিনিময়ে দত্তক দিয়ে পরে অপহরণের গল্প ফাঁদেন মা’। ঘটনায় এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া।
ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়াারি) দুপুরে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায়। কথিত ভিক্টিম আকলিমা আক্তার (২৮) দেবীদ্বার পৌর এলাকার বিনাইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং মো. কামাল হোসেন (৪২)-এর স্ত্রী। কামাল পেশায় অটোরিকশা চালক ও রাজমিস্ত্রীর সহকারী।
প্রাথমিকভাবে জানা যায়, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে আকলিমাকে অচেতন করে তার শিশু কন্যাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে- এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিষয়টি ভাইরাল হলে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু তদন্তে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।
দত্তকের আড়ালে লেনদেন দত্তক প্রহণকারী আবু সাঈদ জানান, সামাজিক মাধ্যমে অপহরণের খবর দেখে তিনি বিব্রত হন। তার দাবি, আকলিমা স্বেচ্ছায় শিশুটিকে দত্তক দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি দেবীদ্বার সদরের আল মদীনা হাসপাতালে এসে চিকিৎসক ও নার্সের উপস্থিতিতে শিশুকে হস্তান্তর করেন। শর্ত ছিল- পরদিন স্বামীকে নিয়ে এসে কন্ট্রাক্ট ফর্মে স্বাক্ষর করে টাকা গ্রহণ করবেন।
আবু সাঈদ বলেন, “১৭ বছর বিবাহিত জীবনেও আমি সন্তানের বাবা হতে পারিনি। শিশুটিকে পেয়ে আমাদের পরিবার আনন্দে ভরে যায়। শুক্রবার বিকেলেই প্রায় ১৫ হাজার টাকার পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনি। অথচ হঠাৎ অপহরণের নাটক সাজিয়ে গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেওয়া হলো।”
আল মদীনা হাসপাতালের নার্স রহিমা আক্তার জানান, আকলিমা তার স্বামীর নেশাগ্রস্ত আচরণ ও আর্থিক অক্ষমতার কথা বলে শিশুটিকে দত্তক দিতে চান। পূর্বে দুই সন্তান থাকায় ভরণপোষণে কষ্ট হচ্ছিল বলেও জানান। পরে পরিচিত সূত্রে আবু সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. ফিরোজ আহমেদ বলেন, “তিন দিন ধরে ওই নারী আমার কাছে এসে শিশুকে দত্তক দেওয়ার কথা বলছিলেন। আমি স্পষ্ট জানাই, স্বামীকে নিয়ে এসে নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্র সম্পন্ন করতে হবে।”
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি সংলগ্ন সাবের বাজার এলাকায় আকলিমাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে স্বামী ও পরিবারের কাছে হস্তান্তরর করে। তবে সঙ্গে থাকা নবজাতকের কোনো খোঁজ মেলেনি।
এই ঘটনার পর এলাকায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। দারিদ্র, পারিবারিক অস্থিরতা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, সব মিলিয়ে এক মায়ের এমন সিদ্ধান্ত প্রশ্নের মুখে ফেলেছে সমাজব্যবস্থাকেই। একদিকে নিঃসন্তান দম্পতির দীর্ঘ প্রতীক্ষার আনন্দ, অন্যদিকে জন্মদাত্রী মায়ের অস্বীকার। সব মিলিয়ে দেবীদ্বারের এই ঘটনা এখন কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি এক বেদনাময় সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আকলিমা আক্তার(২৮) জানান, আমি কি কারনে এমন করলাম আমি নিজেই বুঝতে পারছিনা। তবে দত্তক দিয়ে কোন টাকা নেই নাই। এ ঘটনায় কামাল হোসেন দেবীদ্বার থানায় অজ্ঞাতনামা ২/৩ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন, “আমি যত কষ্টেই থাকি, বাচ্চা বিক্রি করব না।
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, অপহরনের ঘটনাটি প্রথম দিক থেকেই সন্দেহে ছিল। আকলিমার আচরণ, কথাবার্তায় সঙ্গতি ছিলনা। এ ঘটনায় পুলিশ হয়রানী হলেও সত্যাটা প্রকাশ এবং মা’ মেয়ে একত্র হতে পেরেছে।

রোববার, ০১ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে