কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মেহার গ্রাম এখন কৃষি বৈচিত্র্যের এক নতুন উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন শীতের বিদায়বেলায় মাঠের প্রচলিত শীতকালীন টমেটোর আয়ু ফুরিয়ে আসছে, ঠিক সেই মুহূর্তে মেহার গ্রামের ফসলের মাঠে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক ব্যস্ততা। এখানে শীতের শেষে নতুন করে টমেটোর চারা রোপণ করছেন কৃষকরা, যার লক্ষ্য, তপ্ত গ্রীষ্মে রসালো টমেটোর জোগান দেওয়া। এই অসময়ের কৃষিযুদ্ধে মেহার গ্রামের কৃষক হাবিবুল্লাহ এখন এক পরিচিত মুখ। তিনি তার ১২ শতাংশ জমিতে শুরু করেছেন গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চাষ, যা স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।
সাধারণত টমেটোকে শীতকালীন সবজি হিসেবেই ধরা হয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার আর কৃষকের সাহসিকতায় এখন ঋতুর সীমানা ছাড়িয়ে গেছে এই ফসল। হাবিবুল্লাহর ১২ শতাংশ জমির এই প্রকল্পে আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। বর্তমান সময়ে যখন চড়া মূল্যের বাজারে চাষাবাদ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই পরিমিত ব্যয়ে বড় লাভের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। হাবিবুল্লাহ জানান, বর্তমানে বাজারে যেসব টমেটো পাওয়া যাচ্ছে, তা মূলত শীতকালীন ফলন। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই এই ফলনের মৌসুম শেষ হয়ে যাবে এবং বাজার থেকে দেশি টমেটো প্রায় হারিয়ে যাবে। ঠিক সেই শূন্যতা পূরণের লক্ষ্যেই তিনি এখন নতুন চারা রোপণ করেছেন।
গ্রীষ্মকালীন এই টমেটো চাষের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো বাজারমূল্য। শীতকালে যখন টমেটোর বাম্পার ফলন হয়, তখন অনেক সময় উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে তা বিক্রি করতে হয়। কিন্তু গ্রীষ্মকালে যখন বাজারে সবজির সংকট দেখা দেয় এবং টমেটোর জোগান কমে যায়, তখন চড়া দামে বিক্রি করার সুযোগ থাকে। কৃষক হাবিবুল্লাহর হিসেব অনুযায়ী, তার রোপণ করা এই ফসল যখন ফলন দেবে, তখন বাজারে টমেটোর সংকট থাকবে তুঙ্গে। ফলে সাধারণ সময়ের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি দামে তিনি তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত লাভ নয়, বরং স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মেহার গ্রামের এই কৃষি উদ্যোগ কেবল একটি ফসলের চাষ নয়, বরং এটি পরিবর্তনের একটি চিত্র। এখানকার কৃষকরা বুঝতে পেরেছেন যে, প্রথাগত চাষাবাদের চেয়ে সময়ের চাহিদাকে গুরুত্ব দিলে অর্থনৈতিকভাবে অনেক বেশি স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব। হাবিবুল্লাহর এই ১২ শতাংশ জমির নিবিড় পরিচর্যা দেখে এখন গ্রামের অন্য কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তবে গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ মোটেও সহজ কাজ নয়। প্রখর রোদ, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং পোকা-মাকড়ের আক্রমণ সামলানোর জন্য প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। হাবিবুল্লাহ অত্যন্ত ধৈর্য ও শ্রমের মাধ্যমে মাটির গুণাগুণ বজায় রেখে এই চাষ এগিয়ে নিচ্ছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চান্দিনার মেহার গ্রামের এই উদ্যোগ সফল হলে তা পুরো উপজেলায় ছড়িয়ে পড়বে। এতে করে একদিকে যেমন কৃষকের পকেটে বেশি টাকা আসবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোক্তারাও অসময়ে সতেজ টমেটোর স্বাদ পাবেন। হাবিবুল্লাহর মতো প্রান্তিক কৃষকদের হাত ধরেই বাংলাদেশের কৃষি খাত আজ আধুনিক ও বাণিজ্যিক রূপ নিচ্ছে। চৈত্র-বৈশাখের দাবদাহ যখন চারপাশ পুড়িয়ে দেবে, তখন হাবিবুল্লাহর মেহার গ্রামের সেই বারো শতাংশ জমিতে লাল টমেটোর হাসি বলে দেবে, পরিশ্রম আর সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ঋতুকেও জয় করা সম্ভব। এই নতুন স্বপ্ন আর সম্ভাবনার হাতছানি এখন মেহার গ্রামের প্রতিটি কৃষকের চোখেমুখে, যা বদলে দিতে পারে এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।

বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে