আধুনিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় কৃষিতে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। এক সময় লাঙল-জোয়াল আর হাড়ভাঙা খাটুনিই ছিল কৃষকের ভাগ্য, কিন্তু বর্তমানে কৃষিপ্রযুক্তির ছোঁয়ায় বোরো চাষের কর্মযজ্ঞ হয়ে উঠেছে অনেক বেশি সহজতর ও গতিশীল। কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সেই আধুনিকতার জয়গান। ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে যন্ত্রের ব্যবহার কৃষকের সময় ও শ্রম উভয়ই বাঁচিয়ে দিচ্ছে। প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের সংমিশ্রণে বোরো চাষে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে এই জনপদে।
চান্দিনা উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ১০ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে উপজেলার ৬২ হাজার ৭৫০টি কৃষি পরিবারের অক্লান্ত পরিশ্রম। তবে এই পরিশ্রমকে ফলপ্রসূ করতে কৃষকরা এখন কেবল ঐতিহ্যের ওপর নির্ভর করছেন না, বরং ঝুঁকছেন উচ্চফলনশীল আধুনিক জাতের দিকে। ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এবার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে ব্রি ধান৮৯ ও ব্রি ধান৯২। কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এই জাতগুলো হেক্টরপ্রতি রেকর্ড পরিমাণ ফলন দিচ্ছে, যা কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
তবে নতুন জাতের ভিড়েও চান্দিনার কৃষকদের কাছে একটি বিশেষ নাম অত্যন্ত জনপ্রিয়, আর তা হলো স্বর্ণ জাতের ধান। এই জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে এর অভাবনীয় ফলন ক্ষমতা ও স্বল্প জীবনকাল। স্থানীয় মেহার গ্রামের কৃষক আবুল কাশেমের মতে, স্বর্ণ জাতের ধান প্রতি শতাংশে চার থেকে পাঁচ মণ পর্যন্ত ফলন দেয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খুব অল্প সময়ে ঘরে তোলা যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ করে আগাম কালবৈশাখী বা শিলাবৃষ্টির হাত থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকরা তাই এই স্বল্পমেয়াদী জাতকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। প্রকৃতির অনিশ্চয়তার মাঝে দ্রুত ফসল ঘরে তোলাই এখন চান্দিনার কৃষকদের প্রধান কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠে গিয়ে দেখা যায়, এখন আর আগের মতো সারি সারি কিষাণকে ধান রোপণ বা কাটার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজতে হয় না। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর আর হারভেস্টারের শব্দে মুখর থাকে ফসলের মাঠ। প্রযুক্তির এই অনুপ্রবেশ চাষাবাদের খরচ কমিয়ে এনেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আগে যেখানে এক একর জমির ধান কাটতে কয়েক দিন সময় লাগত এবং অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, এখন যন্ত্রের সাহায্যে কয়েক ঘণ্টাতেই সেই কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এই আধুনিকায়ন কৃষিকে কেবল একটি জীবনযাত্রার মাধ্যম থেকে লাভজনক পেশায় রূপান্তরিত করছে।
চান্দিনা উপজেলার এই বিশাল বোরো আবাদ সফল করতে মাঠ পর্যায়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাবৃন্দ। সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সার ও বীজ বিতরণ এবং সরাসরি মাঠে গিয়ে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। বিশেষ করে রোগবালাই দমন ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কৃষকদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি সহায়তা আর কৃষকের সদিচ্ছা এক হয়ে চান্দিনাকে বোরো উৎপাদনের একটি সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত করেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি এড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটাতে পারলে বোরো চাষে আগামীতে আরও বড় সাফল্য আসা সম্ভব। চান্দিনার কৃষকরা এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তাই করেন না, বরং কীভাবে কম খরচে ও কম সময়ে মানসম্পন্ন ধান ঘরে তোলা যায়, সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বোরো চাষের এই বদলে যাওয়া চিত্র কেবল চান্দিনা নয়, বরং সারা বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। কৃষকের মেধা আর যন্ত্রের শক্তি মিলেমিশে সোনালী ধানের শীষে রচিত হচ্ছে সমৃদ্ধ আগামীর গল্প।

রোববার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে