আজ ১৩ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব বেতার দিবস। প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমাদের বিনোদনের মাধ্যম বদলেছে, বদলেছে যোগাযোগের ধরণ। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন সংবাদ, বিনোদন কিংবা সমাজের মানুষের একত্র হওয়ার একমাত্র উপলক্ষ ছিল বেতার। এবারের বিশ্ব বেতার দিবসে পাঠকদের লেখায় উঠে এসেছে বেতারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, গ্রামবাংলার সামাজিক বন্ধন এবং সময়ের স্রোতে এই মাধ্যমের বিবর্তনের চিত্র।
হারিয়ে যাওয়া বেতার ও সোনালী অতীত
ফারনাজ মুক্তা
২০১২ সাল থেকে ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব বেতার দিবস। বেতার কেবল একটি যন্ত্র নয়, এটি মানবসভ্যতার এমন এক আবিষ্কার যা তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে এর জুড়ি মেলা ভার। পৃথিবীর দুর্গমতম স্থানেও মুহূর্তের মধ্যে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে বেতার।
একসময় গ্রামের মানুষের কাছে বিনোদন মানেই ছিল বেতার। নজরুল-রবীন্দ্রসংগীত, বাংলা ছায়াছবির গান, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কিংবা টানটান উত্তেজনার খেলার ধারাবিবরণী—সবকিছুর উৎস ছিল এই বাক্সটি। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির সংকেত বা রাজনৈতিক খবর জানার জন্যও মানুষ কান পাতত রেডিওতে। তবে আধুনিক যুগে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের দাপটে সেই সনাতন রেডিও আজ বিলুপ্তপ্রায়। গ্রামের হাটবাজারেও এখন আর ব্যাটারিচালিত রেডিওর দেখা মেলে না। প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এই বেতার আগামী প্রজন্মের কাছে হয়তো শুধুই এক সোনালি স্মৃতি হয়ে থাকবে।
শিক্ষার্থী: সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ।
উঠোনভর্তি আড্ডা ও ঐক্যের বন্ধন
রুহুল আমিন
একসময় রেডিও এবং টেলিভিশন ছিল মানুষের আবেগের চূড়ান্ত স্থান। যার বাড়িতে একটি রেডিও বা টিভি থাকত, তিনি যেন এলাকাজুড়ে সমাদৃত হতেন। সারাদিন মাঠের কাজ শেষে রাতে যখন সবাই টিভির সামনে বা রেডিও ঘিরে গোল হয়ে বসত, মনে হতো যেন এক উৎসব লেগেছে। প্রতি রাতে কোনো এক উঠানে বসত প্রাণের মেলা, যেখানে সবাই পূর্ণাঙ্গ তৃপ্তি পেত।
সেই আনন্দঘন মুহূর্তে বিঘ্ন না ঘটে, তাই যেন ঝিঁঝি পোকাও তাদের ডাক থামিয়ে গহীন নিস্তব্ধতায় রূপ দিত। আসর শেষ হলেই সবার মুখে ফুটত তৃপ্তির হাসি। শুরু হতো আখ্যান—কে কী শিখল তা নিয়ে আলোচনা। কেউ বলত, "দুঃখে কাউকে ছাড়তে নেই", কেউবা নাটকের উদাহরণ টানত। আমাদের সেই সোনালী অতীত আর হয়তো ফিরবে না। প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমরা যত এগোচ্ছি, ততই যেন সেই একাত্মবোধ আর মনুষ্যত্ব থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।
শিক্ষার্থী: অর্থনীতি বিভাগ (১ম বর্ষ), সরকারি আকবর আলী কলেজ।
বেতার এক আবেগের নাম
ইকরাম আকাশ
টেলিভিশন-পূর্ববর্তী বিনোদনের মাধ্যম ছিল বেতার। পরবর্তীতে সময়ের পরিক্রমায় বেতার হয়ে ওঠে তরুণদের ভরসার সঙ্গী। বেতারে যেন মনের প্রশান্তি নিয়ে এগিয়ে আসে। সকলের মনে গুনগুন করে ওঠে পছন্দের গান, আবহাওয়ার গতিবিধি, জ্যামের পরিস্থিতি এবং কানে গুঁজে রাখা হেডফোন এক নস্টালজিয়া।
ভূত এফএম, আরজে কিবরিয়া, আরজে মিথিলাসহ অনেকের নাম কিংবা আর্টসেল, শিরোনামহীন, পুরোনো দিনের গান অথবা তৎসময়ে জনপ্রিয় সকল গানের ভান্ডারে যেন পরিপূর্ণ ছিল বেতার। বেতার শুধু গানের জন্য নয়, প্রিয় মানুষের কাছে মেসেজ পাঠানোরও সহজ মাধ্যম। যদিও এখন বেতারে কিছুটা ভাঁটা পড়েছে তবুও বৃদ্ধ থেকে বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই আবেগের নাম বেতার।
শিক্ষার্থী: সরকারি কমার্স কলেজ, চট্টগ্রাম।
বেতার কেবল খবর বা গানের বাক্স ছিল না, এটি ছিল মানুষে-মানুষে যোগাযোগের এক অদৃশ্য সেতু। প্রযুক্তির ভিড়ে হয়তো রেডিওর সেই জৌলুস কমেছে, কিন্তু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাতায় বেতার চিরকাল অমলিন হয়েই থাকবে।
বিষয় : তারুণ্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যাল

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে