সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
The Dhaka News Bangla

হাতিয়ায় শুঁটকি শিল্পে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা, বাড়ছে সম্ভাবনা ও শঙ্কা

হাতিয়ায় শুঁটকি শিল্পে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা, বাড়ছে সম্ভাবনা ও শঙ্কা
হাতিয়ায় শুঁটকি শিল্পে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা, বাড়ছে সম্ভাবনা ও শঙ্কা

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম শুরু হতেই জেলে পরিবার গুলোর মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন মৎস্যঘাট, চরাঞ্চল ও খোলা মাঠজুড়ে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ চলছে পুরোদমে। মৌসুমি এই শিল্পকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরলেও একই সঙ্গে মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও শিশু শ্রমের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

হাতিয়ার রহমত বাজার, কাজিরবাজার, জঙ্গলিয়া, জাহাজমারা কাটাখালী ও নিঝুমদ্বীপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় রেণু মাছ, ছোট চিংড়ি ও ছেউয়া মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরি করছেন জেলে পরিবারগুলো। সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় সারি সারি মাছ রোদে শুকানো হচ্ছে। কেউ মাছ বিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ নিয়মিত উল্টে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকিয়ে যাওয়া শুঁটকি সংগ্রহ করে বাছাই ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। এসব কাজে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু ও কিশোর শ্রমিকদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো।

জেলে পরিবারগুলোর দাবি, শুঁটকি উৎপাদন এখন তাদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। মৌসুমজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদকদের অধীনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। কেউ দৈনিক মজুরিতে, আবার কেউ মাসিক বেতনে নিয়োজিত। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শিশু শ্রমিকদের কেউ কেউ মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আয় করছে, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকরা দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন।

উৎপাদকরা জানান, ছোট চিংড়ির শুঁটকি মাছ চাষ ও পশুখাদ্য শিল্পে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। বর্তমানে প্রতি মণ শুঁটকি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাতিয়ার বিভিন্ন হাট-বাজার ছাড়াও জেলার বাইরে বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছেও এসব শুঁটকি সরবরাহ করা হয়।

সম্প্রতি জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ছেউয়া মাছ ধরা পড়ায় উৎপাদন বেড়েছে। বড় মাছ তাজা অবস্থায় বাজারজাত করা হলেও ছোট মাছ শুঁটকি হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকানো এসব শুঁটকির স্বাদ ভিন্ন হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।

তবে স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করছে, নির্বিচারে রেণু ও ক্ষুদ্র চিংড়ি মাছ আহরণ ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শিশু শ্রমের ব্যাপক ব্যবহার সামাজিক ও আইনি দিক থেকে উদ্বেগজনক।

পরিবেশবাদী ও সামাজিক কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।

ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি মৌসুমে হাতিয়া থেকে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হলেও উৎপাদন প্রক্রিয়াটি এখনো মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে এই শিল্প আরও প্রসার লাভ করতে পারে।

হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ফয়জুর রহমান বলেন, উৎপাদকরা আগ্রহ দেখালে কেমিক্যালমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং শিশু শ্রম নিরুৎসাহিত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুঁটকি শিল্প হাতিয়ার জন্য টেকসই আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় স্বল্পমেয়াদি লাভের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

বিষয় : নোয়াখালী

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে

The Dhaka News Bangla

সোমবার, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


হাতিয়ায় শুঁটকি শিল্পে ব্যস্ত সময় পার করছে জেলেরা, বাড়ছে সম্ভাবনা ও শঙ্কা

প্রকাশের তারিখ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image
নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুম শুরু হতেই জেলে পরিবার গুলোর মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন মৎস্যঘাট, চরাঞ্চল ও খোলা মাঠজুড়ে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ চলছে পুরোদমে। মৌসুমি এই শিল্পকে ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরলেও একই সঙ্গে মৎস্য সম্পদ রক্ষা ও শিশু শ্রমের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।হাতিয়ার রহমত বাজার, কাজিরবাজার, জঙ্গলিয়া, জাহাজমারা কাটাখালী ও নিঝুমদ্বীপসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় রেণু মাছ, ছোট চিংড়ি ও ছেউয়া মাছ প্রক্রিয়াজাত করে শুঁটকি তৈরি করছেন জেলে পরিবারগুলো। সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় সারি সারি মাছ রোদে শুকানো হচ্ছে। কেউ মাছ বিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ নিয়মিত উল্টে দিচ্ছেন, আবার কেউ শুকিয়ে যাওয়া শুঁটকি সংগ্রহ করে বাছাই ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। এসব কাজে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশু ও কিশোর শ্রমিকদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো।জেলে পরিবারগুলোর দাবি, শুঁটকি উৎপাদন এখন তাদের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। মৌসুমজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছে। স্থানীয় উৎপাদকদের অধীনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। কেউ দৈনিক মজুরিতে, আবার কেউ মাসিক বেতনে নিয়োজিত। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, শিশু শ্রমিকদের কেউ কেউ মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা আয় করছে, অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকরা দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পাচ্ছেন।উৎপাদকরা জানান, ছোট চিংড়ির শুঁটকি মাছ চাষ ও পশুখাদ্য শিল্পে ব্যাপক চাহিদাসম্পন্ন। বর্তমানে প্রতি মণ শুঁটকি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাতিয়ার বিভিন্ন হাট-বাজার ছাড়াও জেলার বাইরে বড় পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছেও এসব শুঁটকি সরবরাহ করা হয়।সম্প্রতি জেলেদের জালে প্রচুর পরিমাণে ছেউয়া মাছ ধরা পড়ায় উৎপাদন বেড়েছে। বড় মাছ তাজা অবস্থায় বাজারজাত করা হলেও ছোট মাছ শুঁটকি হিসেবে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকানো এসব শুঁটকির স্বাদ ভিন্ন হওয়ায় পর্যটকদের মধ্যেও এর চাহিদা বাড়ছে।তবে স্থানীয় সচেতন মহলের একটি অংশ মনে করছে, নির্বিচারে রেণু ও ক্ষুদ্র চিংড়ি মাছ আহরণ ভবিষ্যতে মৎস্য সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শিশু শ্রমের ব্যাপক ব্যবহার সামাজিক ও আইনি দিক থেকে উদ্বেগজনক।পরিবেশবাদী ও সামাজিক কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য এই দুই বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি মৌসুমে হাতিয়া থেকে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হলেও উৎপাদন প্রক্রিয়াটি এখনো মূলত অপ্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা গড়ে তোলা গেলে এই শিল্প আরও প্রসার লাভ করতে পারে।হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ফয়জুর রহমান বলেন, উৎপাদকরা আগ্রহ দেখালে কেমিক্যালমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে শুঁটকি উৎপাদনের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ এবং শিশু শ্রম নিরুৎসাহিত করার কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুঁটকি শিল্প হাতিয়ার জন্য টেকসই আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হতে পারে। অন্যথায় স্বল্পমেয়াদি লাভের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

The Dhaka News Bangla

সম্পাদক: তাসকিন আহমেদ রিয়াদ 

কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত