পর্যটনের নামে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া উপজেলা ও নিঝুম দ্বীপে যেসব আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস গড়ে উঠেছে, তার একটি অংশ এখন আর শুধু পর্যটকদের বিশ্রামের জায়গা নয়—বরং অসামাজিক কার্যকলাপের নিরাপদ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব হোটেলে নিয়মিতভাবে মাদক সেবন, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সন্দেহজনক আসা-যাওয়া চলছে, যা হাতিয়ার যুবসমাজকে ঠেলে দিচ্ছে ভয়ংকর নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে।
স্থানীয়রা বলছেন, যদি হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপে ‘হোটেলের আড়ালের অন্ধকার’ থামানো না যায়, তাহলে পর্যটন নয়—এই দ্বীপাঞ্চল পরিচিত হবে নৈতিক অবক্ষয় আর অপরাধের নতুন হটস্পট হিসেবে। তখন দায় এড়াতে পারবে না কেউ—না প্রশাসন, না জনপ্রতিনিধি, না সমাজ।
দিনের আলোয় স্বাভাবিক মনে হলেও রাত নামলেই এসব আবাসিক হোটেলের চেহারা বদলে যায়, এমনটাই বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু হোটেলে বাইরের লোকজনের অবাধ যাতায়াত, কিশোর-তরুণদের আনাগোনা এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড নিয়মিত ঘটছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব হোটেলকেন্দ্রিক অনিয়মের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে কিশোর ও তরুণদের ওপর। সহজ টাকার লোভ, মাদক এবং তথাকথিত ‘স্ট্যাটাস কালচার’—সব মিলিয়ে একটি অংশ দ্রুত অপরাধ ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই অনিয়মগুলো দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর অভিযান বা স্থায়ী ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝেমধ্যে প্রতীকী অভিযান হলেও তা লোক দেখানোতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
রাজনৈতিক–প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের অভিযোগ, স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে, এসব আবাসিক হোটেলের পেছনে রয়েছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সিন্ডিকেট। অভিযোগ আছে, নিয়ম বহির্ভূতভাবে লাইসেন্স, নজরদারির শিথিলতা এবং আগাম ‘খবর’ দেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ কর্মকাণ্ড টিকে আছে।
বিশেষ করে নিঝুম দ্বীপে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হোটেল ও কটেজের সংখ্যা বাড়লেও নেই পর্যাপ্ত তদারকি। পরিবেশ ও সামাজিক শালীনতার কোনো মানদণ্ড মানা হচ্ছে কি না -সে প্রশ্নও আজ বড় হয়ে উঠেছে।
উপজেলার সচেতন মহল মনে করছেন, আবাসিক হোটেলের লাইসেন্স ও কার্যক্রম পুনঃযাচাই, রাত্রীকালীন কঠোর নজরদারি, মাদক ও অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত অভিযান।
হাতিয়া উপজেলার জাতীয় যুবশক্তির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সৈকত প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, এগুলো একা কোনো হোটেল মালিকের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। এখানে বড় ছাতা আছে—রাজনীতি আর প্রশাসনের ভেতরেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, পর্যটন উন্নয়নের কথা বলে যা হচ্ছে, তা আসলে নৈতিক ধ্বংসের লাইসেন্স। আমাদের ছেলেরা ভুল পথে যাচ্ছে, অথচ কেউ দেখেও না দেখার ভান করছে।
হাতিয়া থানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রতিদিনের কাগজকে বলেন, আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউসগুলো নিয়মিত নজরদারির আওতায় রয়েছে। মাদক, অসামাজিক কার্যকলাপ বা কিশোরদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে চরাঞ্চল ও পর্যটন মৌসুমে নজরদারি আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলাউদ্দিন বলেন, হাতিয়া উপজেলা ও নিঝুম দ্বীপের আবাসিক হোটেল গুলোতে কোনো ধরনের অসামাজিক বা আইনবহির্ভূত কার্যকলাপ বরদাশত করা হবে না। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক শালীনতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব। তাই এসকল বিষয়ে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেলে নিয়মিত প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে