ধূমপানের ক্ষতি আজ আর অজানা নয়। সিগারেট হা,তে নেওয়া মানেই নিকোটিনের মতো বিষ শরীরে টেনে নেওয়া। কিন্তু যে মানুষটি সিগারেট ধরেন না, নিজে ধূমপায়ী নন, তিনিও কীভাবে ধীরে ধীরে একই ক্ষতির দিকে এগিয়ে যান এই সত্য অনেকেই এড়িয়ে যান। পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকিং এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই নীরব আতঙ্ক।
অনেক পরিবারেই দেখা যায় সিগারেট ধরেন বাবা। ধোঁয়া ছড়ায় ঘরজুড়ে। টেলিভিশনের সামনে বসে থাকা ছোট্ট সন্তানটা চুপচাপ সেই ধোঁয়া টেনে নেয় ফুসফুসে এই দৃশ্য আমাদের সমাজে খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এই স্বাভাবিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ সত্য: পৃথিবীজুড়ে শিশুদের সুস্থ থাকার প্রায় ৮.৪৫ মিলিয়ন দিন নষ্ট হচ্ছে শুধু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে।
ইউরোপিয়ান রেসপিরেটরি সোসাইটি-এর সাম্প্রতিক কংগ্রেসে প্রকাশিত নতুন গবেষণা বলছে, শিশুদের জন্য পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। চীনের হাংঝাউ নরমাল ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও গবেষক ড. সিউ দাই জানান, “পরোক্ষ ধূমপান শিশুদের মৃত্যু ও রোগব্যাধির অন্যতম বড় কারণ। তাদের ফুসফুস এখনও বেড়ে ওঠার বয়সে, আর নিজের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও নেই।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, প্রতি বছর ১২ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের কারণে অকালমৃত্যুর শিকার হন; এর মধ্যে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু অন্তত ৬৫ হাজার। কিন্তু মৃত্যু ছাড়াও আরও অনেক শিশু সারাজীবনের মতো শারীরিক সমস্যায় ভোগে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে শুধু শিশুদের মধ্যেই পরোক্ষ ধূমপানে যে রোগগুলো বেশি হয়েছে, তার হিসাব ভয়াবহ। নিউমোনিয়া ও অ্যাকিউট ব্রঙ্কাইটিসের মতো নিম্ন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। একটি শিশুর সামনে সিগারেট ধরলে তার শৈশবের একটি অংশ আমরা নিজের হাতে পুড়িয়ে দিচ্ছি।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর শিশুদের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। যেসব অঞ্চল আর্থ-সামাজিক সূচকে উন্নত তাদের তুলনায় দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে এই সংক্রমণ বেশি।
অর্থাৎ, একদিকে সচেতনতা, আইন, প্রশস্ত ঘর ও বায়ু চলাচলের সুবিধা এগুলো উন্নত অঞ্চলের শিশুদের রক্ষা করছে। আর অন্যদিকে দারিদ্র্য, অজ্ঞতা, ঠাসাঠাসি ঘর, দুর্বল তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতি এসব কারণে দরিদ্র অঞ্চলের শিশুরা জন্ম থেকেই অনিরাপদ।
ইউরোপিয়ান রেসপিরেটরি সোসাইটির টোব্যাকো কন্ট্রোল কমিটির প্রধান ড. ফিলিপোস ফিলিপিডিস বলেন, “শিশুরা সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। তারা ঘর থেকে বের হতে পারে না, ধোঁয়া এড়াতে পারে না। তাই কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ঘরোয়া সচেতনতা উভয়ই জরুরি।”
তিনি আরও সতর্ক করেন, ই-সিগারেট বা হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্টের বাড়তি বিপণন ভবিষ্যতে শিশুদের ওপর নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সিগারেট না খেলে নিজের ফুসফুস রক্ষা হয় এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু একটি শিশু, যে জন্মের সময় থেকেই অসহায়, তার সুস্থ থাকার দিনগুলো রক্ষা করা এটি আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
ঘর, গাড়ি বা কোনো বদ্ধ পরিবেশে ধূমপান বন্ধ করতে হবে। শিশুদের সামনে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা উচিত। ই-সিগারেটকেও ঝুঁকিমুক্ত মনে করা যাবে না। স্কুল, ডে-কেয়ার, খেলার মাঠ এসব স্থানে ধূমপান নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়ন দরকার। কাগজে কলমে বিদ্যমান আইন বাস্তবে প্রয়োগ করে জনসম্মুখে ধূমপান বন্ধে ভূমিকা রাখতে হবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থানকে।
পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়া চোখে দেখা যায়, কিন্তু এর প্রভাব দেখা যায় শিশুদের দীর্ঘশ্বাসে; শ্বাসকষ্টে, কাশিতে, দুর্বল ইমিউনিটিতে, এমনকি তাদের হারানো শৈশবে।
শিশুরা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাদের সুস্থ থাকার অধিকার রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। আজ যদি আমরা সিগারেট নিভিয়ে রাখি, আগামী প্রজন্ম একটু বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারবে।
সূত্র: ইউরোপিয়ান রেসপিরেটরি সোসাইটি

বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে