দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। ফেসবুক হ্যাকিং, ডিপফেক ভিডিও, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল থেকে শুরু করে ই-কমার্স প্রতারণা, সব মিলিয়ে এটা এখন সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় তরুণদের সাইবার সুরক্ষায় আশার আলো হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফাত চৌধুরীর ‘সাইবার এইড বাংলাদেশ’। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি এখন দেশের অন্যতম কার্যকর সাইবার সাপোর্ট নেটওয়ার্ক।
‘ভয় নয়, প্রতিকার’বএই স্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করে সাইবার এইড। মাত্র তিন বছরে প্ল্যাটফর্মটি ১ হাজার ৭০০টির বেশি আনুষ্ঠানিক অভিযোগে সহায়তা দিয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে পাশে থেকেছে আরও প্রায় ৪ হাজার ভুক্তভোগীর, যাদের ৭৬ শতাংশই নারী। প্রতিষ্ঠাতা আরাফাত চৌধুরী বলেন, “আমাদের দেশে সাইবার অপরাধ মানে এখন শুধুই মানসিক যন্ত্রণা নয়, এটি সামাজিক মর্যাদাহানিরও কারণ। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ অভিযোগ করার পথ জানেন না বা সাহস পান না। আমরা এই নীরবতা ভাঙতে চেয়েছি।”
সাইবার এইডের কার্যক্রম শুধু আইনি সহায়তায় সীমাবদ্ধ নয়। আইন, প্রযুক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ে তারা একটি বহুমাত্রিক সহায়তা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে। ভুক্তভোগীরা হেল্পলাইনের মাধ্যমে সরাসরি বিশেষজ্ঞ পরামর্শ পান। পাশাপাশি পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এবং সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় করে অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করে সংগঠনটি।
ভুক্তভোগী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইসরাত জাহান সুমনা তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “একজন আমার ছবি ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করছিল। লজ্জায় দিশেহারা হয়ে সাইবার এইডে যোগাযোগ করি। তারা শুধু আইনি পথই দেখায়নি, মানসিকভাবেও সাহস জুগিয়েছে।” একইভাবে অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি বলেন, “একটি অনলাইন পেজ থেকে টাকা নিয়েও পণ্য দেয়নি। সাইবার এইড আমার অভিযোগ পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এখন জানি, প্রতারিত হলেও লড়াই করা যায়।”
ভুক্তভোগীদের এমন অভিজ্ঞতাই এখন সাইবার এইডের শক্তি। ব্যক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি দেশব্যাপী সাইবার সচেতনতা তৈরিতেও কাজ করছে তারা। আরাফাত বলেন, “সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; ডিজিটাল শিক্ষাও জরুরি। এজন্য আমরা ক্যাম্পাসভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি হাতে নিয়েছি।”
ইতোমধ্যে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইবার সচেতনতা ক্যাম্পেইন করেছে সাইবার এইড। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৫৬টির বেশি সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করেছে, যেখানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক ও অভিভাবকরা অংশ নিয়েছেন। অনলাইনে “বেসিক সাইবার লিটারেসি”, “সাইবার স্পেস সিকিউরিটি” ও “ডিজিটাল ফরেনসিক” কোর্সও পরিচালনা করছে তারা।
তবে এই পথচলা সহজ ছিল না। সীমিত সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ঘাটতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আরাফাত বলেন, “শুরুতে অনেকেই বিশ্বাস করত না যে ছাত্ররা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম চালাতে পারবে। কিন্তু ধৈর্য, টিমওয়ার্ক আর নিষ্ঠাই আমাদের এগিয়ে নিয়েছে।” বর্তমানে তাঁর নেতৃত্বে ৭০ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবী আইন, প্রযুক্তি ও সচেতনতা, এই তিন বিভাগে কাজ করছেন।
ভবিষ্যতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে সাইবার সচেতনতা ক্লাব প্রতিষ্ঠা এবং একটি জাতীয় হেল্পলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। আরাফাতের স্বপ্ন, একদিন বাংলাদেশ হবে এমন একটি দেশ, যেখানে প্রযুক্তি হবে মুক্তির হাতিয়ার, ঝুঁকির নয়। তাঁর ভাষায়, “আইন, শিক্ষা আর প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ে তরুণরাই একটি নিরাপদ সাইবার বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।”

সোমবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৫

যুক্ত থাকুন দ্যা ঢাকা নিউজের সাথে