ডেস্ক নিউজ ||
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর সমাপ্ত করে নিউইয়র্ক ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৩০ মিনিটে তাঁকে বহনকারী এমিরেটসের একটি ফ্লাইট জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশে যাত্রা করে। দুবাই হয়ে ফ্লাইটটি ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং সফরসঙ্গীরা। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী বাসসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।সূচি অনুযায়ী, ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় দুবাই পৌঁছাবে। সেখান থেকে রাত ২টায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ ও বাংলাদেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরাসফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রথমবারের মতো বাংলায় দেওয়া ভাষণ। ২৪ সেপ্টেম্বরের ওই বক্তব্যে তিনি বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন।বৈশ্বিক শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের উদ্যোগের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী সংঘাত নিরসনে সংলাপ, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতায়ন, সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন’ বা থ্রি-আর কৌশলের বিষয়টিও ভাষণে তুলে ধরেন।রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকনিউইয়র্ক অবস্থানকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের বিষয়টি উঠে আসে। জলবায়ু সহনশীলতা ও বহুপক্ষীয় কার্যক্রমে বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেন জাতিসংঘ মহাসচিব।এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালেহর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি ও রোটারি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ২৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত প্রাতরাশ বৈঠকেও অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে মানবিক সংকট মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নিয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।একই দিনে গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে পৃথক আলোচনায় জনস্বাস্থ্য, শিশুসেবা, টিকাদান, সাশ্রয়ী টিকা, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাসফরকালে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও মতবিনিময় হয়।ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে এবং মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন মোহাম্মদ লতিফের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেনকোভিচের সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতার বিষয়গুলো স্থান পায়।পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।এ ছাড়া হাইতির প্রধানমন্ত্রী আলিক্স দিদিয়ে ফিলস-এমের সঙ্গে বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের পরিকল্পনা‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও টেকসই পৃথিবী নিশ্চিত করতে সম্মিলিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।এ সময় গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত ও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বের হুমকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উদ্বোধনী বক্তব্যেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরেন তিনি। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানো, সহজলভ্য ও পূর্বানুমেয় অভিযোজন অর্থায়ন, জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন।বাংলাদেশ, সুইডেন ও ইউএনএফপিএ আয়োজিত ধাত্রীবিদ্যাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘সুস্থ বাংলাদেশ’ গড়ার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা জানান তিনি।প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার নতুন করে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। তাঁদের মধ্যে ৮০ হাজার নারী এবং ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ বা ধাত্রী থাকবেন। পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও কার্যকর করতে সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনাবিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।নিউইয়র্ক সফরের শেষ দিনে ম্যানহাটনে জেপিমরগানের সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠানটির আয়োজনে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নেন তিনি। এ সময় অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।পরে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
বোয়িংয়ের সঙ্গে উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিসফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বাড়ানো এবং নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।এ ছাড়া ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আয়োজিত বিশ্বনেতা ও তাঁদের জীবনসঙ্গীদের সম্মানে দেওয়া স্বাগত প্রাতরাশে স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশগ্রহণকারী নেতাদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত সংবর্ধনাতেও যোগ দেন তাঁরা।সফরের আরেকটি কর্মসূচিতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।পাঁচ দিনের নিউইয়র্ক সফরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, জাতিসংঘের কর্মকর্তা, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসব কর্মসূচিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অগ্রাধিকার তুলে ধরার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত