সুজন চন্দ্র রায়, স্টাফ রিপোর্টার ||
একসময় প্রতিদিনের মতো বই-খাতা হাতে স্কুলে যেত রাকিব হোসেন। সহপাঠীদের সঙ্গে হাসি-আনন্দ, খেলাধুলা আর সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর ছিল তার জীবন। কিন্তু হঠাৎ এক বিরল চক্ষু সমস্যায় সেই স্বপ্ন আজ যেন গভীর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেললেও এখনও আশায় বুক বেঁধে আছেন ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ। তার একটাই আকুতি—উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পেলে আবারও পৃথিবীর আলো দেখতে চান তিনি।রাকিব হোসেন দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ী ইউনিয়নের বাসুলী গ্রামের মাঝিপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি মো. একরামুল হকের একমাত্র সন্তান। ২০২১ সালে খানসামা সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ তার ডান চোখ লাল হয়ে যায়। সঙ্গে শুরু হয় তীব্র ব্যথা ও অনবরত পানি পড়া। প্রথমে সাধারণ সমস্যা মনে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অবস্থার অবনতি ঘটে।পরিবার প্রথমে বীরগঞ্জের বিবি কাঞ্চন চক্ষু হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। পরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শে ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই বছরের শেষ দিকে তার ডান চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর পরিবার কিছুটা আশাবাদী হলেও মাত্র আট মাসের ব্যবধানে একই ধরনের জটিলতা দেখা দেয় বাম চোখেও।এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা সংগ্রাম। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি ২০২২ সালে ভারতের কলকাতার অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল ও শিলিগুড়ির হিমালয় আই ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয় রাকিবকে। সেখানকার বিশেষজ্ঞরা আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ের শংকর নেত্রালয়া হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন।পরিবারের দাবি, চেন্নাইয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎসকরা জানান, পূর্বে দেশে দেওয়া কিছু চিকিৎসা পদ্ধতিতে গুরুতর ত্রুটি ছিল। ঢাকার একটি বিশেষায়িত চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসকরাও একই ধরনের মতামত দেন। এদিকে দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয়ে পরিবারের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়। জমিজমা বিক্রি, ধারদেনা ও আত্মীয়-স্বজনের সহায়তা নিয়েও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যায়নি রাকিবের চোখের দৃষ্টি। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন।তবে চিকিৎসকদের মতে, এখনও সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রাকিবের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা, যা তার নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে বহন করা অসম্ভব।রাকিব হোসেন বলেন, "আমি বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, দেশের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন এবং সকল হৃদয়বান মানুষের কাছে বিনীত আবেদন জানাচ্ছি—আপনারা আমার পাশে দাঁড়ান। আপনাদের সহযোগিতা পেলে হয়তো আবারও এই সুন্দর পৃথিবী, আমার বাবা-মায়ের মুখ এবং প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখতে পারব।"রাকিবের বাবা মো. একরামুল হক বলেন, "একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতে পারে না, যখন নিজের সন্তান সামনে থেকেও আমাকে দেখতে পারে না। ছেলের চিকিৎসার জন্য যা ছিল সব ব্যয় করেছি। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য আরও বিপুল অর্থ প্রয়োজন, যা আমাদের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। তাই সরকার, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ, বিভিন্ন মানবিক সংগঠন ও দেশের সকল দানশীল মানুষের কাছে আমাদের আকুল আবেদন—আপনারা আমার সন্তানের জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসুন।"উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহনিমা তরফদার বলেন, "এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। সমাজের মানুষ যদি নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। মানবিক কাজে এগিয়ে আসা আমাদের সবার দায়িত্ব।"উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুজ্জামান সরকার বলেন, "রাকিবের ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। সম্মিলিত উদ্যোগই পারে একজন তরুণকে নতুন জীবনের আশা ফিরিয়ে দিতে।"পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করা গেলে দ্রুত বিদেশে উন্নত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। তাই তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বিভিন্ন মানবিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন।একটি সময়োপযোগী মানবিক উদ্যোগই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে এক তরুণের হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টিশক্তি, অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং নতুন করে বেঁচে থাকার অধিকার।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত