ওসমান গনি , চান্দিনা প্রতিনিধি ||
সবুজ গাছগাছালির বুক চিরে ভোরের আলো ফুটতেই চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে হাজারো পাখির কলকাকলিতে। ডানার ঝাপটানি আর মিষ্টি মধুর সুরে ঘুম ভাঙে স্থানীয় মানুষের। কোনো কৃত্রিম বনাঞ্চল নয়, এটি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার এতবারপুর ইউনিয়নের বানিয়াচং গ্রামের এক অপরূপ বাস্তব চিত্র। গ্রামের মোড়ের দক্ষিণ পাশের পুকুরপাড়ের গাছগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল পাখির অভয়ারণ্য। যেখানে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি এবং অতিথি পাখি পরম নিশ্চিন্তে ডানা জুড়ায়, বাসা বাঁধে এবং বংশবৃদ্ধি করে। কিন্তু প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম স্বর্গরাজ্যে এখন নেমে এসেছে এক চরম অমানিশা। একদল স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী মহলের নিষ্ঠুর থাবায় বিপন্ন হতে চলেছে এই নিরাপদ আশ্রয়স্থল।কয়েক বছর ধরে বানিয়াচং গ্রামের এই পুকুরের দক্ষিণ পাড়ের গাছগুলো পাখিদের নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এখানে বক, পানকৌড়ি, শালিক, টিয়া, ঘুঘুসহ নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরা দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। সারা দিন চারপাশের মাঠ-ঘাট থেকে খাবার সংগ্রহ করে গোধূলিলগ্নে তারা ডেরায় ফিরে আসে। তখন পুরো এলাকার আকাশ যেন পাখিদের ডানায় ঢেকে যায়। এই নান্দনিক দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে জীববৈচিত্র্যের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই অভয়ারণ্যটি এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এলাকার সাধারণ মানুষও এই পাখিদের নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতোই ভালোবাসেন এবং আগলে রাখেন।তবে দুঃখের বিষয় হলো, প্রকৃতির এই অপরূপ উপহারকে ধ্বংস করতে মেতে উঠেছে একদল বিবেকহীন মানুষ। ইদানীং একটি কুচক্রী মহল এই অভয়ারণ্যের ওপর কালো থাবা বসিয়েছে। তারা দিনে-রাতে বিভিন্ন নিষ্ঠুর কায়দায় পাখি শিকার করছে। কখনো জাল পেতে, কখনো এয়ারগান বা বিষটোপ ব্যবহার করে নির্বিচারে পাখি নিধন করা হচ্ছে। শুধু শিকারই নয়, পাখিদের বাসা ভেঙে দেওয়া, ডিম নষ্ট করা এবং ঢিল ছুড়ে অনবরত হয়রানি করার মতো অমানবিক ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। ফলে প্রতিনিয়ত কমছে পাখির সংখ্যা, আর আতঙ্কে অনেক পাখিই চিরতরে ছেড়ে চলে যাচ্ছে এই চেনা আশ্রয়। কুচক্রী মহলের এই বেপরোয়া আচরণের কারণে স্থানীয় সচেতন মহলের ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন তীব্র হচ্ছে।পাখি শিকার কেবল একটি নিষ্ঠুর কাজই নয়, এটি প্রচলিত আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অমান্য করে এই চক্রটি প্রকাশ্যেই তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা নিজেদের সাধ্যমতো পাখিদের পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, প্রভাবশালী ও চতুর শিকারিদের চক্রান্তের কাছে তারা অনেক সময়ই অসহায় হয়ে পড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই চান্দিনার এই ঐতিহ্যবাহী পাখির রাজ্যটি চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে, যা স্থানীয় পরিবেশের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।এমতাবস্থায়, প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। এলাকার সর্বস্তরের জনগণ এই অভয়ারণ্যটি রক্ষার জন্য চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং বন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। অবিলম্বে এই এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে পাখি শিকারী ও হয়রানিকারীদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। একই সাথে স্থানটিকে সরকারিভাবে ‘পাখির অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে একটি স্থায়ী আইনি সুরক্ষার বলয় তৈরি করার দাবি জানাচ্ছে এলাকাবাসী।পাখিরা প্রকৃতির এক পরম বন্ধু, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয়দের সচেতনার সম্মিলিত প্রয়াসই পারে বানিয়াচং গ্রামের এই পাখির অভয়ারণ্যটিকে আবার চিরচেনা শান্ত ও নিরাপদ রূপে ফিরিয়ে দিতে। প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই নিষ্পাপ পাখিদের কলকাকলি চিরতরে স্তব্ধ হওয়া থেকে রক্ষা করবে, এমনটাই এখন চান্দিনাবাসীর প্রত্যাশা।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত