মোঃ আরিফ হোসেন , উপজেলা প্রতিনিধি নোয়াখালী সদর ||
নোয়াখালী বিভাগ দীর্ঘদিনের দাবির পেছনে কী কী যৌক্তিকতা রয়েছে। নোয়াখালী বিভাগ দাবি কতটা যৌক্তিক ইতিহাস, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহাসিক জেলা নোয়াখালী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নোয়াখালীকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।
স্থানীয় জনগণ,সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন পেশাজীবী দীর্ঘদিন ধরে ‘নোয়াখালী বিভাগ’ ঘোষণার দাবি জানিয়ে আসছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দাবি কি শুধুই আঞ্চলিক আবেগ, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাস্তব ও যৌক্তিক ভিত্তি, বিষয়টি নিয়েই এই প্রতিবেদন।
নোয়াখালী কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং রেমিট্যান্স ও অর্থনৈতিক অবদান। নোয়াখালী দেশের অন্যতম রেমিট্যান্সসমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি-শিক্ষার দিক থেকেও নোয়াখালীর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। এখানে অবস্থিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি), নোয়াখালী সরকারি কলেজসহ একাধিক স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ভাষা, সাহিত্য ও লোকসংস্কৃতিতেও জেলার রয়েছে নিজস্ব পরিচিতি।
ইতিহাস ও পর্যটন-
নোয়াখালীর ইতিহাস সমৃদ্ধ। মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতিবিজড়িত গান্ধী আশ্রম, ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদ এবং নিঝুম দ্বীপ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ভাষাগত স্বাতন্ত্র্য-
নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষা বাংলাদেশের অন্যতম স্বতন্ত্র উপভাষা হিসেবে পরিচিত। এর নিজস্ব উচ্চারণ ও শব্দভাণ্ডার দেশের লোকসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
কেন উঠছে ‘নোয়াখালী বিভাগ’ গঠনের দাবি?
বর্তমান বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চল বলতে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর জেলা বোঝানো হয়। এই তিন জেলা নিয়ে একটি পৃথক বিভাগ গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের।
প্রশাসনিক সুবিধা-
বর্তমানে এই অঞ্চল চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। বিভাগীয় সদর দপ্তর চট্টগ্রামে হওয়ায় প্রশাসনিক নানা কাজে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। পৃথক বিভাগ হলে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি অফিসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তর স্থানীয়ভাবে স্থাপিত হবে। এতে সেবাপ্রাপ্তি সহজ হবে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
জনসংখ্যা-বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৭০ লাখের বেশি। জনসংখ্যার দিক থেকে এটি দেশের কয়েকটি বিদ্যমান বিভাগের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা-
রেমিট্যান্স ছাড়াও কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং হাতিয়া ও নিঝুম দ্বীপকে ঘিরে সম্ভাবনাময় সমুদ্র অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে।
অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে তুলনা-
প্রস্তাবিত নোয়াখালী বিভাগে থাকবে ৩টি জেলা, যেখানে আনুমানিক জনসংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হবে রেমিট্যান্স, কৃষি ও সমুদ্র অর্থনীতি।
অন্যদিকে বর্তমান সিলেট বিভাগে রয়েছে ৪টি জেলা এবং প্রধান অর্থনৈতিক উৎস প্রবাসী আয়, চা শিল্প ও পর্যটন। বরিশাল বিভাগে রয়েছে ৬টি জেলা, যেখানে কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্লেষকদের মতে, জেলা সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চল একটি পৃথক বিভাগ হওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে।কী কী চ্যালেঞ্জ রয়েছে?-
যদিও স্থানীয় পর্যায়ে দাবিটি জোরালো, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সরকার ইতোমধ্যে ‘মেঘনা’ ও ‘পদ্মা’ নামে নতুন বিভাগ গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এ অবস্থায় নোয়াখালীকে সম্ভাব্য মেঘনা বিভাগের অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা রয়েছে। তবে নোয়াখালীর অনেক নাগরিক ও বিভিন্ন সংগঠন স্বতন্ত্র ‘নোয়াখালী বিভাগ’-এর পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
এ ছাড়া নতুন বিভাগ গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশাসনিক জনবল নিয়োগ এবং উল্লেখযোগ্য সরকারি ব্যয়।সার্বিক মূল্যায়ন-বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াখালী বিভাগ গঠনের দাবি শুধু আঞ্চলিক আবেগের ওপর ভিত্তি করে নয়; এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার মতো বাস্তব যুক্তি। ভবিষ্যতে সরকার যদি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেয়, তাহলে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে বিবেচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত