তানজিদ শুভ্র, ক্যাম্পাস প্রতিনিধি ||
বিশ্বকাপ ফুটবল এলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে যে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, তা সত্যি অনন্য। পাড়ায় পাড়ায় প্রিয় দলের জার্সি গায়ে জড়ানো, চায়ের দোকানে তুমুল আড্ডা, কিংবা বাড়ির ছাদ বা দেয়াল পছন্দের দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে তোলা—এসবই আমাদের ক্রীড়াপ্রেমের খাঁটি বহিঃপ্রকাশ। চার বছর পর পর আসা এই টুর্নামেন্ট আমাদের দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে এক দারুণ মুক্তি দেয়। তবে এই আবেগের জোয়ারে ভেসে গিয়ে আমরা মাঝে মাঝে এমন কিছু কাজ করে ফেলি, যা শুধু বিপদই ডেকে আনে না, বরং আমাদের জাতীয় আত্মসম্মানকেও প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।প্রতি বিশ্বকাপেই আমরা সংবাদমাধ্যমে কিছু হৃদয়বিদারক খবর দেখতে পাই। উঁচু ভবনের কার্নিশে, ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বা গাছের মগডালে বিশাল আকারের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বা পা পিছলে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। একটু স্থির হয়ে ভেবে দেখা দরকার, যে উৎসব শুধুই আনন্দের জন্য, তা কেন একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ হবে? প্রিয় দলকে সমর্থন করা অবশ্যই দারুণ ব্যাপার, কিন্তু নিজের বা অন্যের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনকভাবে পতাকা ওড়ানো কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। আবেগের বশবর্তী হয়ে জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা ভুলে যাওয়া মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়।এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি দৃষ্টিকটু লাগে যখন দেখা যায় ভিনদেশি বিশাল পতাকার ভিড়ে আমাদের নিজেদের লাল-সবুজ পতাকাটি একেবারেই হারিয়ে গেছে। অনেকেই প্রিয় দলের কয়েকশ ফুট লম্বা পতাকা বানান, পুরো রাস্তা ঢেকে দেন, অথচ নিজ দেশের পতাকার কোনো অস্তিত্বই সেখানে থাকে না। আবার কেউ কেউ দেশের পতাকা ওড়ালেও তা অন্য দেশের পতাকার চেয়ে আকারে অনেক ছোট থাকে অথবা নিচে অবস্থান করে। এটি শুধু অনুচিতই নয়, বরং এটি আমাদের স্বাধীন সত্তার জন্য চরম অবমাননাকর।বাংলাদেশ জাতীয় পতাকা বিধিমালা অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের পতাকার সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে হলে বাংলাদেশের পতাকাটি অবশ্যই সবার ওপরে এবং অধিকতর সম্মানের স্থানে থাকতে হবে। অন্য কোনো দেশের পতাকা আমাদের জাতীয় পতাকার চেয়ে বড় হতে পারবে না। আমরা যখন অন্য দেশের বিশাল পতাকা ওড়াই আর নিজ দেশের পতাকাকে অবহেলা করি, তখন প্রকারান্তরে আমরা নিজেদের অস্তিত্বকেই ছোট করি। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই পতাকার সম্মান রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।খেলাধুলা মানুষের মনে আনন্দ দেয় এবং ভ্রাতৃত্ববোধ শেখায়, তাই এই আনন্দ উদ্যাপনের উপায়গুলোও হতে হবে পরিশীলিত। অযথা বিশাল আকারের পতাকা বানানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে আমরা সেই অর্থ কোনো সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করতে পারি। পতাকা ওড়ানোর ক্ষেত্রে সর্বদা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত স্থান বেছে নেওয়া এবং ভিনদেশি পতাকার পাশাপাশি অবশ্যই সঠিক মাপের বাংলাদেশের পতাকা সবার ওপরে রাখা নিশ্চিত করতে হবে। ফুটবল নিয়ে আমাদের এই নিখাদ ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। আমরা যেকোনো দলকে সমর্থন করতেই পারি, কিন্তু সেই সমর্থন যেন আমাদের অন্ধ না করে দেয়। নিজের জীবনের সুরক্ষা এবং নিজের দেশের পতাকার সম্মান—এই দুটি অপরিহার্য বিষয় নিশ্চিত করেই যেন আমরা মেতে উঠি বিশ্বকাপের আসল আনন্দে।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত