মোঃ পায়েল , ক্যাম্পাস প্রতিনিধি ||
বলা হয়ে থাকে, একটি ছবি হাজারটি শব্দের সমান। কখনো কখনো হাজার শব্দের দীর্ঘ বর্ণনাও যে অব্যক্ত অনুভূতি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, ক্যামেরার একটি ক্লিক যেন মুহূর্তেই তার সবটুকু বলে দেয়। ফটোগ্রাফি হলো সময়ের বুকে এক চিমটি আলো দিয়ে আঁকা চিরন্তন এক চিত্রনাট্য; চারপাশের বয়ে চলা জীবনের যে মুহূর্তটি এইমাত্র হারিয়ে গেল, তাকে অনন্তকালের জন্য বন্দি করার এক জাদুকরী শিল্প।বিখ্যাত মার্কিন ফটোগ্রাফার ইমোজেন কানিংহাম একবার বলেছিলেন, "আমার প্রিয় ছবি হলো সেটিই, যা আমি আগামীকাল তুলবো।" প্রতিটি নতুন ফ্রেমে অদেখা কোনো গল্পকে বুনে নেওয়ার এই যে চিরন্তন তাড়না, কানিংহামের সেই দর্শনেরই যেন এক নিভৃত, নীরব অনুসারী মো. আবদুল্লাহিল মারুফ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সাবেক এই শিক্ষার্থীর চোখে লেন্স কোনো যান্ত্রিক কাচ নয়, বরং আলো-ছায়া আর অনুভূতির এক জীবন্ত ক্যানভাস, যা সাধারণ দৃশ্যপটকেও রূপ দেয় অসাধারণে। তার হাত ধরেই লালমাটির এই ক্যাম্পাসে জন্ম নিয়েছে এক অনন্য ফটোগ্রাফি প্ল্যাটফর্ম-'প্রভালোচন'।আলো আর চোখের সন্ধি: 'প্রভালোচন'২০২২ সালের শরৎ আর হেমন্তের সন্ধিক্ষণে মারুফ শুরু করেন তার এই শৈল্পিক যাত্রা। 'প্রভা' মানে আলো, আর 'লোচন' মানে চোখ। "চোখের আলোতে চিত্র ভাসুক" এই গভীর জীবনবোধ থেকেই 'প্রভালোচন' নামের উৎপত্তি। লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের এই সাবেক শিক্ষার্থী ও ফটোগ্রাফারের কাছে ক্যামেরা কেবল যন্ত্র নয়, বরং এক অদৃশ্য অনুভূতির দোভাষী।সংগ্রাম থেকে সৃষ্টির পথেমারুফের শুরুর গল্পটা আর দশটা রূপকথার মতো মসৃণ ছিল না। চাচাতো ভাইয়ের কাছ থেকে কেনা একটি পুরোনো ক্যামেরা আর বুকভরা স্বপ্নই ছিল তার একমাত্র পুঁজি। পরিবারের অগোচরে ছবি তোলা, স্বজনদের অবজ্ঞা কিংবা প্রতিবেশীদের বাঁকা চাহনি সবই সইতে হয়েছে তাকে। জীবনের ধূসর সময়গুলোতে যখন হতাশা ঘিরে ধরেছে, মারুফ তখন আশ্রয় খুঁজে নিয়েছেন ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে। শত বাধা সত্ত্বেও তিনি ফটোগ্রাফিকে আঁকড়ে ধরে থেকেছেন অস্তিত্বের তাগিদে।এক জীবন্ত ফ্রেম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস মারুফের চোখে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং অনুভূতির এক বিশাল সমাহার। তিনি বিশ্বাস করেন, লালমাটির এই ক্যাম্পাসের প্রতিটি মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি গল্প কখনো তা জয়ের উল্লাসের, কখনোবা একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাসের। মারুফের লেন্স এড়িয়ে যায় না কিছুই। তার কাছে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া কৃত্রিম পোজের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান ক্যাফেটেরিয়ার ধোঁয়া ওঠা আড্ডার প্রাণচাঞ্চল্য, কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের শ্রান্ত দেহভঙ্গি কিংবা চৈত্রের তপ্ত দুপুরে ক্লান্ত পথকুকুরের অবুঝ চাহনি।ক্যাম্পাসের চেনা রাস্তা, করিডোর কিংবা কৃষ্ণচূড়ার ডালে যে অদেখা সৌন্দর্য সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না, মারুফ সেটিই পরম মমতায় ফুটিয়ে তোলেন তার ফ্রেমে।ভালোবাসাই যখন প্রাপ্তিখ্যাতি বা প্রতিপত্তির মোহ কোনোদিন টানেনি মারুফকে। তিনি চেয়েছিলেন ‘প্রভালোচন’-এর আড়ালে থেকেই ক্যাম্পাসের এক টুকরো ইতিহাস হয়ে থাকতে। তার নিরলস কাজের সার্থকতা মেলে এক বিকেলে, যখন ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এক ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী তাকে চিনে ফেলে প্রশ্ন করেন, "আপনিই কি প্রভালোচন?" মারুফের কাছে সেই মুহূর্তটি ছিল তার দীর্ঘ সাধনার শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে আলো-ছায়ার ফ্রেমে বন্দি করে রাখা এই শিল্পী যেন কুবি ক্যাম্পাসের এক নীরব চিত্র-দার্শনিক। চেনা আঙিনায় অচেনা সব দৃশ্যকাব্য বুনে মারুফ প্রমাণ করেছেন সঠিক দৃষ্টি থাকলে একটি সাধারণ মুহূর্তও হয়ে উঠতে পারে কালজয়ী কোনো ইতিহাস।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত