ওসমান গনি , চান্দিনা প্রতিনিধি ||
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ এখন যাত্রী, চালক এবং পথচারীদের জন্য এক আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। প্রায় একশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই অংশে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দাপিয়ে বেড়ানো অবৈধ যানবাহন, উল্টো পথে চলার প্রতিযোগিতা এবং চালকদের বেপরোয়া গতির কারণে এই মহাসড়কটি এখন আক্ষরিক অর্থেই এক ‘মরণফাঁদে’ রূপান্তরিত হয়েছে। প্রতিদিন এই সড়কে প্রাণ ঝরছে সাধারণ মানুষের, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য যাত্রী, যার ফলে মহাসড়ক সংলগ্ন জনপদগুলোতে এখন চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার ভয়াবহতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত ৯জানুয়ারী/২০২৬ ইং কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঢাকা-ট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি ও ইলিয়টগঞ্জ এলাকায় পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ছয়জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪১ জন। (ঢাকা টাইমস) ১৩ জানুয়ারী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ট্রাকের পেছনে স্লিপার বাসের ধাক্কায় নাহিদ (৪৬) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনায় আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। ( রাইজিং কুমিল্লা) এরকম আরও অসংখ্য দুর্ঘটনা অহরহ ঘটছে।আইন অমান্য করে লরিটি উল্টো পথে চলার কারণে ঘটা এই দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন অন্তত দশজন। এর রেশ কাটতে না কাটতেই চান্দিনা বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার একটি অটোরিকশাকে পেছন থেকে পিষে দেয় একটি দ্রুতগামী কাভার্ডভ্যান। এতে একই পরিবারের দুইজন সদস্য প্রাণ হারান, যা মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচলের ভয়াবহ ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। এছাড়া পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির বাসের ধাক্কায় এক মেধাবী কলেজ শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলে দেয়।স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বাস স্ট্যান্ডগুলোতে গড়ে উঠেছে অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড। হাইওয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে প্রশাসনের শিথিলতার সুযোগ নিয়ে মহাসড়কে অবাধে চলছে নছিমন, করিমন, ইজিবাইক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা। দ্রুতগতির দূরপাল্লার যানবাহন চলাচলের পথে এসব ধীরগতির ও ছোট যানবাহন হুটহাট ঢুকে পড়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ডিভাইডারের মাঝখানের ফাঁকা অংশ দিয়ে মোটরসাইকেল ও সাইকেলের উল্টো পথে যাতায়াত করার প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চালকদের ক্লান্তি এবং ফুটওভার ব্রিজের অভাবও সাধারণ পথচারীদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষ এখন ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষেরা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র জেল-জরিমানা দিয়ে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বরং মহাসড়কে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি, অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং উল্টো পথে চলাচলের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি আরও কত প্রাণ কেড়ে নেবে, তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন কুমিল্লার সচেতন সমাজ।এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার সাধারণ মানুষের প্রতি বিশেষ সচেতনতামূলক আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে এবং ঝুঁকি নিয়ে এসব নিষিদ্ধ যানে যাতায়াত বন্ধ না করলে শুধু আইন প্রয়োগ করে এই মৃত্যু মিছিল থামানো সম্ভব নয়।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত