নাঈম আল আরাফ , চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ||
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মী যে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী, তা সামনে আসে শাহ আমানত হলের একটি ঘটনার পর। মোবাইল ফোন কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত নিরাপত্তা কর্মী আতঙ্ক বিপ্লব ওরফে বিপ্লব দা হাতে হলে প্রবেশ করে হামলার চেষ্টা করলে প্রক্টোরিয়াল বডি তাকে আটক করে। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আউটসোর্সিং নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী আতঙ্ক বিপ্লবের কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন কেনেন। পরে বিপ্লব জানতে পারেন ফোনটি চোরাই। বিষয়টি জানার পর তিনি ফোনটি ফেরত চান। ফোনের ক্রেতারা টাকার বিনিময়ে সেটি ফেরত দিতে রাজি হলেও বিপ্লব পুরো টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে কিছু অর্থ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার বিষয়ে উভয় পক্ষ প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়।এ ঘটনার মীমাংসার উদ্যোগ নেন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদ। তার আহ্বানে ফোনের ক্রেতারা শাহ আমানত হলে যান। আতঙ্ক বিপ্লবের বাবা ওই হলের বাবুর্চি হওয়ায় সেখানেই সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে শুরুতে বিপ্লব সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। পরে হলে এসে তিনি দেখতে পান, তার বাবা ঘটনাটির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি একটি দা হাতে শাহ আমানত হলের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং মোবাইল ফোনের ক্রেতাদের ওপর হামলার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।ঘটনার সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আতঙ্ক বিপ্লব নিজেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা হানিফের কর্মী বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি ফোনের ক্রেতাদেরও ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তার দাবি, যারা আগে ছাত্রলীগ করতেন তারা এখন ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. জাবেদ তাদের শেল্টার দিচ্ছেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই ছাত্রদল নেতা তার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি নিয়ে গেছেন। এসব কারণেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন বলে দাবি করেন।ঘটনাচক্রে প্রক্টোরিয়াল বডি ফোনের ক্রেতাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষা করলে সেখানে ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার আলামত পাওয়া যায়। একই সঙ্গে জানা যায়, ভিকটিম ও বাদী উভয় পক্ষ পরস্পরের বন্ধু এবং তারা অতীতে একসঙ্গে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।ঘটনার পর আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে যে, অভিযুক্ত আতঙ্ক বিপ্লব চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আউটসোর্সিং ব্যবস্থার আওতায় নিয়োজিত একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মী। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কোম্পানির নাম আইএসএস, যারা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে একজন নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীর নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও শাহ আমানত হল সংসদের প্রতিনিধি আকাইদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে শাহ আমানত হলে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। গার্ডসহ অন্যান্য কর্মচারীরও সংকট রয়েছে। তিনি বলেন, আজ যেভাবে একজন দা হাতে হলে ঢুকতে পেরেছে, তাতে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে পারত। শাহ আমানত হল বর্তমানে স্পষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে এবং দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।চাকসুর আইন সম্পাদক ফজলে রাব্বি তৌহিদ বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ও বাদী উভয় পক্ষই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী নন। বহিরাগতদের কোনো বিরোধ মীমাংসার নামে বা অন্য কোনো কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে নিয়ে আসা মোটেও কাম্য নয়। তিনি বলেন, যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটত, তার দায় সরাসরি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরই পড়ত। আইএসএসের নিরাপত্তা কর্মী, কর্মকর্তা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত যে-ই হোক না কেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন।এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহিদ সরওয়ার্দি বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা চলমান রয়েছে এবং সামনে আরও পরীক্ষা আছে। শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করাই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, শাহ আমানত হল থেকে ফোন পেয়ে জানা যায়, অস্ত্রসহ এক যুবক হলে প্রবেশ করেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়, মোবাইল ফোন সংক্রান্ত লেনদেনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের কিছু শিক্ষার্থীর সঙ্গে অভিযুক্ত যুবকের বিরোধ হয়। অভিযুক্তের বাবা শাহ আমানত হলে বাবুর্চির চাকরি করায় সমঝোতার জন্য সবাই সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে ওই যুবক দা হাতে হলে প্রবেশ করলে হলের শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে। পরে প্রক্টোরিয়াল বডি তাকে নিরাপত্তা দপ্তরে নিয়ে আসে।প্রক্টর আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত নিজেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়। বিষয়টির স্পর্শকাতরতা বিবেচনায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে এবং প্রশাসনকেও অবহিত করা হয়েছে। আগামীকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দপ্তর থেকে এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হবে বলে তিনি জানান।
কপিরাইট © ২০২৬ The Dhaka News Bangla । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত